— “ফুটবল যুদ্ধ” (Football War), ১৯৬৯
ইতিহাসে এমন কিছু যুদ্ধ আছে, যেগুলোর সূচনা শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হয়। রাষ্ট্রীয় সীমান্ত, ধর্ম, সাম্রাজ্য কিংবা তেল–গ্যাস নয়—একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছিল রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। ইতিহাসে যা পরিচিত “ফুটবল যুদ্ধ” (Football War) নামে।
এই যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৯ সালে মধ্য আমেরিকার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র এল সালভাদর ও হন্ডুরাস–এর মধ্যে। যদিও ফুটবল ছিলো বাহ্যিক উপলক্ষ, প্রকৃত কারণ ছিলো বহু বছর ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তেজনা।
পটভূমিঃ জমি ও অভিবাসন নিয়ে ক্ষোভ
১৯৬০-এর দশকে এল সালভাদর ছিলো মধ্য আমেরিকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। বিপরীতে হন্ডুরাস ছিলো তুলনামূলকভাবে কম জনসংখ্যার অথচ বিস্তীর্ণ জমির দেশ। জীবিকার সন্ধানে প্রায় ৩ লাখের বেশি সালভাদরীয় অভিবাসী হন্ডুরাসে বসবাস করছিলো।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হন্ডুরাসে ভূমি সংস্কার নীতি চালু হয়। স্থানীয় কৃষকদের চাপের মুখে সরকার অভিবাসী সালভাদরীয়দের জমি দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করে। শুরু হয় উচ্ছেদ ও নির্যাতন। হাজার হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়।
এই পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ককে চরম উত্তেজনাপূর্ণ করে তোলে।
ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা অতঃপর বিস্ফোরণ
১৯৭০ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে এল সালভাদর ও হন্ডুরাস মুখোমুখি হয়।
(১) প্রথম ম্যাচে হন্ডুরাস জয়ী হয়। সালভাদরীয় সমর্থকদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
(২) দ্বিতীয় ম্যাচে এল সালভাদর প্রতিশোধ নেয় ম্যাচ জিতে। এবার হন্ডুরাসি সমর্থকদের ওপর সহিংসতা হয়।
(৩) তৃতীয় ম্যাচ ছিলো নিরপেক্ষ ভেন্যু হিসেবে মেক্সিকোতে। এল সালভাদর জয়ী হয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে।
এই ম্যাচগুলোর সময় ও পরবর্তী সময়ে দুই দেশে জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা, মিডিয়ার উসকানি ও সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়।
যুদ্ধের সূচনা: ও মাত্র ১০০ ঘণ্টার রক্তপাত
১৯৬৯ সালের ১৪ জুলাই এল সালভাদর হন্ডুরাসে বিমান হামলা চালায়। শুরু হয় পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘর্ষ।
এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র চার দিন, অর্থাৎ প্রায় ১০০ ঘণ্টা। তাই এটিকে কখনো কখনো “১০০ ঘণ্টার যুদ্ধ”ও বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই—
(১) প্রায় ২,০০০ থেকে ৬,০০০ মানুষ নিহত
(২) লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত
(৩) অবকাঠামো ও অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে যুদ্ধবিরতি
রক্তপাত বাড়তে থাকলে অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস (OAS) হস্তক্ষেপ করে। কূটনৈতিক চাপের মুখে ১৮ জুলাই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
যুদ্ধ থামলেও দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা ও সীমান্ত বিরোধ বহু বছর ধরে চলতে থাকে।
ফুটবলই কি যুদ্ধের কারণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুটবল ম্যাচ ছিল শুধু একটি স্পার্ক। আগুন জ্বলার জন্য প্রস্তুত ছিলো আগে থেকেই। মূল কারণগুলো ছিল—
(১) অভিবাসন সংকট
(২) ভূমি মালিকানা বিরোধ
(৩) অর্থনৈতিক বৈষম্য
(৪) জাতীয়তাবাদী রাজনীতি
(৫) সংবাদমাধ্যমগুলোর উসকানিমূলক সংবাদ প্রচার
ফুটবল সেই চাপা ক্ষোভকে প্রকাশ্যে এনে দেয়।
ইতিহাসের শিক্ষা
“ফুটবল যুদ্ধ” আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
(১) ক্রীড়া কখনো কখনো রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, যেমনটি মনে করা হচ্ছে আইপিএল থেকে পেশার মুস্তাফিজ বাদ পড়াকে কেন্দ্র করে।
(২) গণমাধ্যমের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা সংঘাত বাড়াতে পারে, যেমন; বাংকাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে বর্তমানে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ নাই। অপরদিকে ভারতীয় কিছু কিছু বেসরকারি সংবাদ মাধ্যম, বিশেষ করে ইউটিউব চ্যানেলগুলোর সংবাদ উস্কানিমূলক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে।
(৩) সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে উপেক্ষা করলে সামান্য ঘটনাও বড় বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
একটি গোল, একটি ম্যাচ—আর তার পেছনে লুকিয়ে থাকা অব্যবস্থাপনা—ইতিহাসে রক্তাক্ত অধ্যায় হয়ে উঠেছিলো।
উপসংহার
ফুটবল মানুষের আবেগের খেলা। কিন্তু সেই আবেগ যখন রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক উস্কানি ও সামাজিক বৈষম্যের সঙ্গে মিশে যায়—তখন একটি খেলার মাঠও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
১৯৬৯ সালের “ফুটবল যুদ্ধ” তারই নির্মম স্বাক্ষী।
সূত্রঃ ইন্টারনেট








Leave a Reply