আসসালামু আলাইকুম।
আমি প্রায়ই আমার লেখায় আমাদের পরিচিত
ও প্রচলিত ধর্মীয় রীতি-রেওয়াজের অসংগতি তুলে ধরার চেষ্টা করি। কারণ, এসব রীতির
অনেকটাই একদিকে ধর্ম সম্পর্কে ভুল ও অতিরঞ্জিত বার্তা দেয়, অন্যদিকে ধর্মের নামে
এমন সব কর্মে উৎসাহিত করে যেগুলোর প্রকৃতপক্ষে কোনো ভিত্তি নেই। ফলে “Belief, good
deeds and being a better person” — ধর্মের এই মূল শিক্ষা আড়ালেই থেকে যায়।
আমার লেখায় কেউ দ্বিমত পোষণ করতেই
পারেন, তবে বিনীত অনুরোধ থাকবে, ভিন্নমত থাকলে তা রেফারেন্সসহ শেয়ার করুন—তাহলে
আমরা সবাইই উপকৃত হবো।
আজকের
আলোচ্য বিষয়: ইসলামিক ‘ড্রেস কোড’ — ধারণা না বিভ্রান্তি?
অনেকের কাছে দাড়ি, টুপি, টাখনুর উপর
পায়জামা বা প্যান্ট পরা, হিজাব, নিকাব এগুলো একজন ‘ভাল মুসলমান’ ও ‘খারাপ
মুসলমান’-এর পার্থক্যের প্রধান সূচক বলে মনে হয়। অথচ এই পোশাকগত চিহ্নগুলো ইসলামের
মৌলিক শিক্ষা নয়।
আমরা জানি, মুসলমানদের একমাত্র মূল
ধর্মগ্রন্থ হচ্ছে পবিত্র কোরআন। হাদিস ও তাফসির কোরআনের ব্যাখ্যামূলক
গ্রন্থ, কিন্তু কোরআনই হচ্ছে চূড়ান্ত, পরিপূর্ণ ও স্পষ্ট গ্রন্থ—এতে বলা হয়েছে:
“এই কিতাবটি সুস্পষ্ট, পরিপূর্ণ ও
বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে”।
কোরআন কোথাও স্পষ্টভাবে দাড়ি, টুপি,
পাগড়ি, টাখনুর উপর পায়জামা বা মেয়েদের জন্য হিজাব/নিকাব বাধ্যতামূলক বলে নি। তাই
কেউ এসব পরিধান করতে পারেন ব্যক্তিগত রুচি বা সামাজিক আভিজাত্য হিসেবে, কিন্তু তা
ধর্মীয় ফরজ বা হারাম বলে চাপিয়ে দেওয়া একেবারেই অনুচিত।
কোরআনে
পোশাক নিয়ে যা বলা হয়েছে
নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্য কোরআনের দিকনির্দেশনা মূলত সাধারণ সামাজিক শালীনতা ও
নিরাপত্তা রক্ষার কথা বলে, যেমন:
সুরা নূর (২৪:৩০-৩১)—পুরুষদের দৃষ্ট সংযম ও নারীদের
বুক আবৃত রাখার কথা বলা হয়েছে।
সুরা আহযাব (৩৩:৫৯)—নারীরা যাতে সহজে চেনা যায় এবং
উত্ত্যক্ত না হয়, সে জন্য চাদর বা ওড়না দিয়ে শরীর ঢাকার নির্দেশনা।
কিন্তু এসব আয়াতে ফরজ, হারাম,
গোনাহ, দোজখ — এমন কোনো ধর্মীয় শব্দ ব্যবহৃত হয়নি। সুতরাং এগুলো ‘সামাজিক
নিরাপত্তার সাধারণ পরামর্শ’ হিসেবে বিবেচনা করাই যথার্থ।
দাড়ি,
হিজাব, নিকাব—ধর্ম না সংস্কৃতি?
নবীজীর (সা.) দাড়ি ছিল কিনা সেটা আপনি
জানেন কোন সূত্রে? কোরআনে এমন কোনো বিবরণ নেই। হ্যাঁ, হাদিসে পাওয়া যায়। কিন্তু
প্রশ্ন হচ্ছে—সেই হাদিস কি কোরআনের মানদণ্ডে টিকে আছে?
যারা বলেন, “দাড়ি না রাখলে
মুসলমানিত্ব নেই”, তারা আসলে কোরআনের বদলে নিজেদের প্রচলিত ব্যাখ্যাকেই ধর্মীয়
সূত্রে রূপান্তর করেছেন। অথচ কোরআন এমন কিছু বলেনি।
খিমার শব্দটি এসেছে কোরআনে, যার অর্থ ‘এক টুকরা কাপড়’। কোরআন বলেছে:
“তারা যেন তাদের বুক ঢেকে রাখে” — মুখ, চোখ ঢেকে রাখতে বলেছে কোথায়?
যদি আল্লাহ চাইতেন হিজাব/নিকাব ফরজ
করতে, তাহলে তিনি এককথায় বলতে পারতেন:
“নারীরা যেন পরপুরুষের সামনে
আপাদমস্তক ঢেকে রাখে”।
তিনি তা বলেননি। অতএব এসব অতিরঞ্জিত
ব্যাখ্যা মূলত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন, কোরআনের নয়।
সমাজ ও
যৌনতা: ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি
আমাদের সমাজে নারীর পোশাককে প্রায়শই
যৌন উত্তেজনার উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। অথচ কোরআনে পুরুষকেও সমানভাবে বলা হয়েছে
দৃষ্টি সংযত করতে। সুতরাং, সমস্যা পোশাকে নয়, দৃষ্টিভঙ্গিতে।
ইউরোপ, আমেরিকায় নারীরা খোলামেলা
পোশাক পরেন, কিন্তু সেখানে যৌন হয়রানি ঠেকাতে আইন ও মানবিক মূল্যবোধ কাজ
করে। আর আমাদের সমাজে নারীদের পর্দায় আবৃত করেও যৌন নিপীড়ন বন্ধ করা যাচ্ছে না।
কেন?
পোশাকের
উদ্দেশ্য: সামাজিক সম্মান না ধর্মীয় রিচুয়াল?
“সুরা আরাফ (৭:২৬)” ও “৭:৩১” এ বলা
হয়েছে, পোশাক হচ্ছে সম্মান ও সৌন্দর্যের প্রতীক। সবচেয়ে উত্তম পোশাক হচ্ছে আল্লাহভীতি।
অথচ আমরা পোশাককে বানিয়েছি পাপ-পূণ্যের পরিমাপক।
ইসলামিক
রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তিগত অধিকার
একজন নারী চাইলেই নিরাপত্তার প্রয়োজনে
হিজাব, নিকাব পরতে পারেন। আবার কেউ পরেন না বলেই যে তিনি ধর্মভ্রষ্ট, তা বলা
একান্ত অন্যায়।
কিন্তু যখন হিজাব, নিকাবকে রাষ্ট্রীয়
বা ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা হয়ে ওঠে
জবরদস্তিমূলক—যা কোরআনের স্পিরিটের পরিপন্থী।
ধর্মীয়
অসহিষ্ণুতা ও লেবেলিং
আজকাল কেউ কোরআনভিত্তিক যুক্তি দিলেই
তাকে ‘ইহুদির দালাল’, ‘কাফের’, ‘নাস্তিক’ বলে গালি দেওয়া হয়। অথচ কোরআন স্পষ্টভাবে
বলে:
“যারা মুমিন পুরুষ ও নারীদের কষ্ট দেয় কোনো অপরাধ ছাড়াই, তারা
অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে” – (৩৩:৫৮)
উপসংহার
আপনি দাড়ি রাখতে পারেন, টুপি পরতে
পারেন, হিজাব বা নিকাব পরতে পারেন—এটা আপনার ব্যক্তিগত অধিকার, সংস্কৃতি ও রুচির
বিষয়। তবে এসবকে ধর্মীয় ফরজ বা বাধ্যবাধকতা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
কোরআন যা ফরজ বা হারাম বলেনি, আপনি
বলবেন কিভাবে?
কোরআন যা কঠিন করেনি, আপনি কঠিন বানাবেন কিসের অধিকার বলে?
সারকথা:
ধর্মকে সহজ রাখুন। বাড়াবাড়ি ত্যাগ করুন। ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় আখলাক,
সহনশীলতা ও যুক্তিবোধে—পোশাক, স্লোগান বা লেবেলে নয়।
![]() |
(সজল রোশনের ভিডিও অবলম্বনে)
আরও পড়ুনঃ ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নঃ মাদ্রাসা পরিচালক গ্রেফতার









Leave a Reply