![]() |
| বীরাঙ্গনা টেপরি রানী বর্মন |
ঠাকুরগাঁও
জেলার রানীশংকৈলের মেয়ে টেপরি বর্মন। টানা টানা চোখের বিনীত চেহারার সেই কিশোরী
মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিল পূর্ণ যৌবনা। বাবা-ভাইয়েরা গর্ব করতেন তাকে নিয়ে। কিন্তু
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের ঝড় আসতেই ভেঙে পড়ে সেই সুখী সংসার।
মুক্তিযুদ্ধ আর টেপরির অসহায়ত্ব
টেপরির বয়স তখন মাত্র ১৬-১৭। প্রতিদিন আতঙ্কে কাটতো তাদের
সময়—কখন যেন পাকিস্তানি সেনারা এসে মেরে ফেলে! এপ্রিলের শেষ দিকে গ্রামের এক
প্রভাবশালী ব্যক্তি টেপরির বাবাকে বললো—
“তোমার মেয়েকে যদি পাকিস্তানি ক্যাম্পে দাও, তবে হয়তো পুরো পরিবার বেঁচে যাবে।”
মৃত্যুভয়ে
অসহায় বাবা একদিন মেয়ের হাত ধরে নিয়ে গেলেন শত্রু ক্যাম্পে। সারাটা পথ বাবা-মেয়ে
একটিও কথা বলেননি। ক্যাম্পে পৌঁছে টেপরিকে তুলে দিয়ে মাথা নিচু করে ফিরে আসেন।
এরপর
টেপরির জীবনে শুরু হয় দীর্ঘ সাত মাসের নরকযন্ত্রণা। প্রতিরাতে কয়েকজন পাকিস্তানি
সেনা পালাক্রমে তাকে ধর্ষণ করতো। অবর্ণনীয় শারীরিক-মানসিক নির্যাতন সহ্য করেই সে
রক্ষা করেছিল নিজের পরিবারকে।
স্বাধীনতার পরের গল্প
দেশ
স্বাধীন হলে বাবা টেপরিকে ঘরে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু তখন টেপরি গর্ভবতী।
গ্রামের
লোকেরা পরামর্শ দিলো সন্তানটি নষ্ট করে দিতে। কিন্তু টেপরির বাবা বললেন—
“না মা, রাখ। এ-ই হবে তোর সম্বল। তোকে তো আর কেউ গ্রহণ করবে না। শেষ বয়সে এই
সন্তানই হবে তোর সম্বল- বেঁচে থাকার অবলম্বন।”
এভাবেই
জন্ম নিল এক ছেলে। নাম রাখলো সুধীর বর্মন।
![]() |
| টেপরি রানী |
অবহেলার শিকার সুধীর
জন্ম
থেকেই সুধীর সমাজের অবজ্ঞার পাত্র। কেউ তার সঙ্গে খেলতো না, তাকে “পাঞ্জাবির
বাচ্চা” বলে ডাকতো, ঘৃণা করে দূরে সরিয়ে রাখতো সবাই।
একবার
তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সে প্রতিবাদ করে না কেনো? সুধীরের উত্তর ছিল—
“ঝগড়া করতে তো লোক লাগে, কিন্তু আমার কে আছে?”
একাকী
জীবন কা্টতে কাটতে সুধীর পেশা হিসেবে বেছে নিলো ভ্যান চালনা। সংসার বলতে মা টেপরি,
স্ত্রী আর এক মেয়ে—‘জনতা’। মেয়েটির পড়াশোনা চালিয়ে গেছে সাধ্যমতো।
জনতা
একদিন দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল—
“দেশে যদি আবার যুদ্ধ হয়, দাদীর মতো আমিও দেশের জন্য নিজের সম্ভ্রম দিতে
দ্বিতীয়বার ভাববো না।”
![]() |
| টেপরি রানী |
উত্তরাধিকার
পাঞ্জাবীদের
মতো মাছ খেতে পারতো না সুধীর। টেপরি বলতো—
“আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না সেই চার পশুকে। সুধীরের মুখ তাদের একজনের মতো।”
গ্লানি সত্বেও
সুধীরের মধ্যে বইতো মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। তাই তার সস্তা বাটন ফোনের রিংটোন হিসেবে
বেছে নিয়েছিলো স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের বিখ্যাত গান —
“এক সাগর রক্তের বিনিময়ে, বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা…”
তাহলে
বলুন তো, সুধীরের শরীরের রক্তটা কার? পাকিস্তানি সেনাদের? নাকি মুক্তিযোদ্ধা টেপরি
রানী বর্মনের?
মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ও বীরাঙ্গনারা
১৯৭১ সালে
পাকিস্তানি সেনাদের হাতে প্রায় দুই লাখ নারী নির্যাতিত হন। তাঁদের অনেকেই
ছিলেন টেপরির মতো অচেনা সাধারণ মানুষ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের
স্বীকৃতি দিয়েছিলেন “বীরাঙ্গনা” হিসেবে।
কিন্তু
দুঃখজনকভাবে স্বাধীনতার পর সমাজ তাঁদের অনেককে গ্রহণ করেনি। অনেকে স্বজন হারিয়ে
একাকী জীবন কাটিয়েছেন। আবার কেউ সন্তান জন্ম দিয়ে সমাজচ্যুত হয়েছেন। তবু তাঁদের
আত্মত্যাগেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিলো।
টেপরি
বর্মনের কাহিনী সেই ইতিহাসেরই প্রতীক—
- যে ইতিহাসে এক নারীর সম্ভ্রমের
বিনিময়ে একটি পরিবার বেঁচে গিয়েছিল। - যে ইতিহাসে সমাজ অবহেলা করেছে
নির্যাতিতাকে, অথচ মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্রোত বহন করেছে তাঁর সন্তানরা।
উপসংহার
টেপরি
রানী বর্মন শুধুই একজন নির্যাতিতা নারী নন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের এক অখ্যাত
বীরাঙ্গনা। ২০১৭ সালে বীরাঙ্গনা খেতাব পান তিনি। এরপর ২০১৮ সালে প্রথম তাঁর ঘটনা
জানতে পারে সবাই। সেটাও বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। বাংলা মায়ের এই দূর্দিনে সম্প্রতি
ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে তাঁর কাহিনী। এ ঘটনাগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতার
মূল্য কেবল রক্ত নয়, অগণিত নারীর আত্মত্যাগও। জানা যায়, খেতাব পাওয়ার পর তিনি প্রত্যাশা
ব্যক্ত করেছিলেন এইভাবে; “লাল-সবুজের পতাকায় জাতি তাকে শেষ বিদায় জানাবে” এটাই তার
বড় পাওয়া।
আজকের
প্রজন্মের উচিত টেপরির মতো নামহীন বীরাঙ্গনাদের স্মরণ করা, তাঁদের সম্মান দেওয়া।
কারণ তাঁদের কান্না, তাঁদের রক্তক্ষরণ, তাঁদের লড়াই ছাড়া এই স্বাধীন বাংলাদেশ
কল্পনাও করা যেতো না।
সূত্রঃ
(১) বাংলা ট্রিবিউন
(২) কথা ও সুরের আলাপনে (Quora) থেকে প্রচলিত
কাহিনী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রামাণ্য তথ্য থেকে সাধারণ প্রেক্ষাপট সংযোজিত।
#মুক্তিযুদ্ধ, #বাংলাদেশ,











Leave a Reply