War of Jenkins’ Ear (১৭৩৯–১৭৪৮)
ইতিহাসে যুদ্ধের কারণ হিসেবে কখনো সীমান্ত, কখনো ধর্ম, কখনো ক্ষমতা ও সম্পদের কথা উঠে আসে। তবে একটি কাটা কান ও একটি লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে যে যুদ্ধ শুরু হতে পারে—তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। অথচ ১৮শ শতকের ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতিতে ঠিক এমন ঘটনাই ঘটেছিল। ইতিহাসে এই সংঘাত পরিচিত “War of Jenkins’ Ear” নামে।
প্রেক্ষাপট: ক্যারিবিয়ান বাণিজ্য ও সাম্রাজ্যবাদী টানাপোড়েন
১৭শ ও ১৮শ শতকে ক্যারিবিয়ান সাগর এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ছিলো ইউরোপীয় শক্তিগুলোর বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু।
- স্পেন দীর্ঘদিন ধরে লাতিন আমেরিকায় একচেটিয়া বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখছিলো
- ব্রিটেন চাইছিল সেই নিয়ন্ত্রণ ভেঙে অবাধ বাণিজ্যে প্রবেশ করতে
এই পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ বণিক জাহাজগুলো প্রায়ই স্পেন-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে চোরাচালান ও অবৈধ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়তো বলে অভিযোগ ছিলো। স্পেন এ ধরনের কার্যক্রম দমনে তাদের কোস্ট গার্ডকে জাহাজ থামানো, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতা দেয়।
মূল ঘটনা: রবার্ট জেনকিন্সের কান কাটা
১৭৩১ সালে ক্যারিবিয়ান সাগরে ব্রিটিশ বণিক জাহাজের ক্যাপ্টেন রবার্ট জেনকিন্স স্প্যানিশ কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হন।
স্পেনের অভিযোগ ছিল—জেনকিন্স অবৈধভাবে বাণিজ্য পরিচালনা করছিলেন।
তল্লাশির সময় স্প্যানিশ কর্মকর্তা জুলিও লিওন ফান্ডিনো জেনকিন্সের একটি কান কেটে নেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তখন বলেন—
“এই কান তোমার রাজাকে দিয়ে দিও, বলো—এটাই তার পরিণতি।”
জেনকিন্স সেই কাটা কান সংরক্ষণ করে রাখেন, যা পরবর্তীতে একটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়।
অভিযোগপত্র ও ব্রিটিশ সংসদে উত্তেজনা
ঘটনার প্রায় সাত বছর পর, ১৭৩৮ সালে ব্রিটেনে স্পেনবিরোধী রাজনৈতিক আবহ জোরদার হতে থাকে। এই সময় রবার্ট জেনকিন্স ব্রিটিশ সংসদের একটি শুনানিতে হাজির হন।
তিনি সেখানে—
- নিজের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের লিখিত বিবরণ (অভিযোগপত্র/চিঠি) পেশ করেন
- কাটা কান প্রদর্শন করেন বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে
সংসদে এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলো এটিকে জাতীয় অপমান হিসেবে তুলে ধরে এবং জনমত দ্রুত স্পেনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করে।
যুদ্ধের ঘোষণা
১৭৩৯ সালে ব্রিটিশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এই সংঘাতই ইতিহাসে পরিচিত হয়—
War of Jenkins’ Ear
যদিও যুদ্ধের নামকরণ একটি নির্দিষ্ট ঘটনার ওপর ভিত্তি করে, বাস্তবে এটি ছিলো বহুদিনের জমে থাকা বাণিজ্যিক ও সাম্রাজ্যিক দ্বন্দ্বের বিস্ফোরণ।
যুদ্ধের প্রকৃত কারণ: কানের আড়ালের রাজনীতি
ইতিহাসবিদদের মতে, জেনকিন্সের কান কাটা ছিল মূলত একটি উসকানি ও প্রতীক। প্রকৃত কারণগুলো ছিল—
- ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ
- উপনিবেশ বিস্তারের প্রতিযোগিতা
- সমুদ্রপথে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা
- স্পেনের একচেটিয়া বাণিজ্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ চাপ
অর্থাৎ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে সামনে রেখে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার লড়াইয়ে নামা হয়।
যুদ্ধের গতিপথ ও ফলাফল
যুদ্ধ মূলত ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, জর্জিয়া ও ফ্লোরিডা কেন্দ্রিক সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ ছিল। বড় কোনো নির্ণায়ক বিজয় কোনো পক্ষই অর্জন করতে পারেনি।
পরবর্তীতে এই যুদ্ধ ইউরোপের বৃহত্তর সংঘাত “War of the Austrian Succession”-এর সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়।
১৭৪৮ সালে Aix-la-Chapelle চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন
“War of Jenkins’ Ear” ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে কয়েকটি কারণে—
- সামান্য একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ ঘোষণার দৃষ্টান্ত
- জনমত ও মিডিয়া কীভাবে রাষ্ট্রকে যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে তার উদাহরণ
- মানবিক ঘটনার আড়ালে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের নগ্ন প্রকাশ
এই যুদ্ধ প্রমাণ করে, অনেক সময় যুদ্ধের ঘোষিত কারণ ও প্রকৃত কারণ এক নয়।
উপসংহার
একটি কাটা কান ও একটি লিখিত অভিযোগ—দেখতে তুচ্ছ হলেও তা হয়ে উঠেছিল একটি সাম্রাজ্যিক সংঘাতের প্রতীক।
War of Jenkins’ Ear আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসে যুদ্ধের পেছনে আবেগ, সম্মান ও নৈতিকতার ভাষা যতই থাকুক না কেন, শেষ পর্যন্ত নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতা ও স্বার্থের রাজনীতি।








Leave a Reply