বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলতে আমরা সাধারণত কিছু পরিচিত নামই বারবার শুনি—সাঁওতাল, গারো, চাকমা, মারমা। কিন্তু এই পরিচিতির বাইরে রয়ে গেছে আরও বহু ছোট ছোট জনগোষ্ঠী। তাদের নাম সরকারি তালিকায় থাকলেও বর্তমান সময়ে বাস্তবে তারা প্রায় অদৃশ্য।
Thank you for reading this post, don’t forget to subscribe!এই অদৃশ্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে—বানাই, বুনা, বেদিয়া, মাহালি, লোধা, কোল, কামার, পানিয়া, কোরা, ডালু, হাদি, পাহাড়িয়া, নাগেসিয়া, রাভা, বিষ্ণুপ্রিয়া, তেলেঙ্গা, কুর্মি, ভিল, মাল, ধানুক, গন্ড—এবং আরও কিছু ক্ষুদ্র গোষ্ঠী।
প্রশ্ন হচ্ছে—এরা কারা? কেন এরা অদৃশ্য?
পরিচয়ের সংকট: নাম আছে, গবেষণা নেই
এই গোষ্ঠীগুলোর বড় একটি সমস্যা হলো—তাদের নিয়ে নির্ভরযোগ্য গবেষণা প্রায় নেই। অনেক ক্ষেত্রে একই গোষ্ঠীর একাধিক নাম (যেমন: বুনা/বুনো, কোল/কোরা)। আবার কিছু নাম আসলে পেশাভিত্তিক পরিচয় (যেমন: কামার, হাদি)। কিছু গোষ্ঠী মূলত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের সম্প্রসারণ (যেমন: গন্ড, ভিল, কুর্মি) ইত্যাদি। ফলে প্রশ্ন উঠে—এরা কি আলাদা জাতিগোষ্ঠী, নাকি বৃহত্তর কোনো গোষ্ঠীর উপশাখা?
আগে এসব জনগোষ্ঠীর লোকজন দেখা গেলেও পেশাগত বৈচিত্র বিলিন হওয়ায় ইদানিং তারা মূল শ্রোতের সাথে মিশে প্রচলিত পেশায় নিয়োজিত, ফলে দৃশ্যমান নয়। যেমন, বুনোরা আগে গ্রামের বিলঝিলে মাছ ধরে বেড়াতো, বেদেরা সাপখেলা দেখিয়ে বেড়াতো, কেউ আবার গ্রামের মহিলাদের কোমড় ব্যাথার অভিনব চিকিৎসা (সিঙ্গা লাগানো) করে বেড়াতো, কেউ চুরিদানা বেচে বেড়াতো। আজকাল এসব পেশার লোক খুজে পাওয়া মুশকিল।
ভৌগোলিক বাস্তবতা: সীমান্তের ইতিহাস
এই ক্ষুদ্র গোষ্ঠীগুলোর বেশিরভাগই পাওয়া যায়—উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল (ভারত সংলগ্ন এলাকা) এবং বন ও গ্রামীণ প্রান্তিক জনপদে।
ঐতিহাসিকভাবে এরা অনেকেই এসেছে বর্তমান ভারতীয় অঞ্চল—ঝাড়খণ্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা থেকে।
অর্থাৎ, রাষ্ট্রভাগ হয়েছে—কিন্তু জনগোষ্ঠীর বিস্তার একই রয়ে গেছে।
জীবিকা: টিকে থাকার লড়াই
এই গোষ্ঠীগুলোর অধিকাংশই এখন—দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক, হস্তশিল্পী (মাহালি, কোরাদের মধ্যে দেখা যায়) কিংবা প্রথাগত পেশা হারিয়ে নতুন কাজে বাধ্য।
একসময় যাদের নিজস্ব পেশা ছিল—আজ তারা বাজার অর্থনীতির চাপে তা হারিয়ে ফেলছে।
ধর্ম ও সংস্কৃতি: মিশ্র পরিচয়
এই গোষ্ঠীগুলোর ধর্মীয় পরিচয় একরৈখিক নয়—কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ আদি ধর্মবিশ্বাস অনুসরণ করে। কিন্তু প্রায় সবার মধ্যেই আছে—লোকজ বিশ্বাস, প্রকৃতি নির্ভর আচার ও আদি সংস্কৃতির ছাপ।
বড় সমস্যা: “অদৃশ্য নাগরিক”
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জনগোষ্ঠীগুলোর অনেকেই কার্যত—শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, ভূমির অধিকারহীন, সরকারি সুবিধা থেকে বিচ্ছিন্ন, সামাজিকভাবে অবহেলিত। তারা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দৃষ্টিতে অনেকটাই “অদৃশ্য”। তবে এই প্রবন্ধ লেখকের পরিচিত কিছু লেখাপড়া জানা লোককে ভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকতে দেখা গেলেও তা অতি অল্প এবং কর্মক্ষেত্রে পরিচয় নিয়ে সংকোচিত থাকতে দেখা গেছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
বাংলাদেশে যখন আমরা উন্নয়ন, ডিজিটাল অগ্রগতি, মানবাধিকার নিয়ে কথা বলি—
তখন কি এই ছোট ছোট জনগোষ্ঠীগুলোর কথা আমরা ভাবি? নাকি তারা শুধু তালিকার সংখ্যায় সীমাবদ্ধ?
উপসংহার: নথিভুক্তির বাইরে মানবিক স্বীকৃতি
এই গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে কাজ করার জন্য প্রয়োজন—সঠিক নৃতাত্ত্বিক গবেষণা, ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং সবচেয়ে বড় কথা—মানবিক স্বীকৃতি।
কারণ—একটি দেশের সভ্যতা শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ দিয়ে মাপা যায় না, বরং তার প্রান্তিক মানুষের অবস্থান দিয়েই তা বিচার হয়।






