বিশ্বের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সামাজিক রীতি-নীতি দেখলে বোঝা যায়, মানুষ একই পৃথিবীতে বাস করলেও সম্পর্ক, প্রেম, বিয়ে ও পরিবার নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা একেক রকম। আমরা যেটাকে “স্বাভাবিক” মনে করি, অন্য কোনো সমাজে সেটাই অদ্ভুত বলে মনে হতে পারে। আবার অন্যদের কোনো প্রথা আমাদের কাছে বিস্ময়কর লাগলেও তাদের কাছে সেটাই বহু প্রজন্মের স্বাভাবিক সামাজিক কাঠামো।
আফ্রিকার দক্ষিণ সুদানের মুন্দারি নৃগোষ্ঠীর বিয়ের প্রথা এমনই এক ব্যতিক্রমী সামাজিক ব্যবস্থা, যা আধুনিক নগর সমাজের অনেক ধারণাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
মুন্দারি সমাজে কোনো তরুণ যদি কোনো তরুণীকে পছন্দ করে, তাহলে তাকে সরাসরি সেই তরুণীকেই নিজের অনুভূতির কথা জানাতে হয়। এখানে পরিবারের মাধ্যমে “প্রস্তাব পাঠানো” বা অভিভাবকদের কাছে আগে অনুমতি চাওয়ার সংস্কৃতি নেই। বরং মেয়ের বাবা-মার কাছে আগে গিয়ে কিছু বলতে গেলে উল্টো সমস্যায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাদের দৃষ্টিতে বিষয়টি খুবই সরল—তুমি যদি মেয়েটিকেই পছন্দ করে থাকো, তাহলে তার সাথেই কথা বলো; তার পরিবারকে দিয়ে কেন শুরু করবে?
এই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে এক ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বাধীনতা আছে। সম্পর্কের সিদ্ধান্তে প্রথম গুরুত্ব দেওয়া হয় ছেলে ও মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দকে।
তরুণী যদি ভেবে দেখে যে ছেলেটিকে তারও ভালো লাগে, তাহলে সে একসময় নিজের কাপড়চোপড় নিয়ে সরাসরি ছেলেটির বাড়িতে গিয়ে ওঠে। এটাই মূলত সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতির সূচনা। অর্থাৎ এখানে মেয়ের সম্মতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। পরিবারের আলোচনা পরে আসে।
এরপর শুরু হয় দুই পরিবারের আনুষ্ঠানিক দেনাপাওনার আলোচনা। তবে এই “যৌতুক” আমাদের দক্ষিণ এশীয় সমাজের প্রচলিত যৌতুক ব্যবস্থার মতো নয়, যেখানে মেয়ের পরিবারকে অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হয়। মুন্দারি সমাজে উল্টো ছেলে পক্ষকে মেয়ে পক্ষকে গরু দিতে হয়।
মুন্দারি জনগোষ্ঠীর জীবনে গরু শুধু সম্পদ নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা, অর্থনীতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। অনেক পরিবারে বিপুল সংখ্যক গরু থাকে। যেহেতু তারা সাধারণত গরু জবাই করে খাওয়ার চেয়ে পালনে বেশি গুরুত্ব দেয়, তাই গবাদিপশুই তাদের সম্পদের প্রধান প্রতীক হয়ে ওঠে।
ফলে বিয়েতে গরু দেওয়া তাদের কাছে অস্বাভাবিক কিছু নয়। পারিবারিক অবস্থা অনুযায়ী প্রায় ২০ থেকে ৭০টি পর্যন্ত গরু কনের পরিবারকে দিতে হয়।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে মজার সামাজিক বৈপরীত্য তৈরি করে। আমাদের উপমহাদেশের বহু সমাজে দীর্ঘদিন ধরে ছেলে সন্তান জন্মকে বেশি আনন্দের হিসেবে দেখা হয়েছে—বংশ রক্ষা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক মানসিকতার কারণে। কিন্তু মুন্দারি সমাজে কন্যাসন্তানও সমানভাবে, বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি আনন্দের কারণ হতে পারে। কারণ মেয়ে বড় হলে বিয়ের মাধ্যমে পরিবারে গরু আসবে।
অবশ্য আধুনিক মানবাধিকার ও লিঙ্গসমতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে প্রশ্নও উঠতে পারে—মানুষের সম্পর্কের সাথে সম্পদের এই বিনিময় কতটা গ্রহণযোগ্য? কোনো সমাজে ছেলে পক্ষ টাকা নেয়, কোথাও মেয়ে পক্ষ গরু নেয়—দুই ক্ষেত্রেই কি মানুষকে কোনো না কোনোভাবে “অর্থনৈতিক লেনদেনের” অংশ বানানো হচ্ছে না?
তবুও একটি বিষয় অস্বীকার করা যায় না—মুন্দারি সমাজের এই ব্যবস্থায় অন্তত সম্পর্কের শুরুটা ছেলে-মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ ও সম্মতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে সামাজিক প্রক্রিয়া শুরু হয় মানুষ দু’জনের সিদ্ধান্তের পরে, আগে নয়।
বিশ্বের নৃগোষ্ঠীগুলোর জীবনব্যবস্থা আমাদের শেখায় যে সমাজ একরৈখিক নয়। প্রেম, বিয়ে, পরিবার—এসবের কোনো একক “সঠিক” মডেল নেই। মানুষ তার পরিবেশ, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতির আলোকে নিজস্ব নিয়ম তৈরি করেছে। সেই বৈচিত্র্যকে জানলে নিজের সমাজকেও নতুনভাবে বোঝা যায়।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের কিছু ‘অদৃশ্য’ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী: নাম আছে, পরিচয় নেই







Leave a Reply