জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বই ‘The Last Days of United Pakistan’ পাকিস্তানের শেষ সময়ের ভেতরের রাজনৈতিক সংকট, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের ভুল এবং পূর্ব বাংলার আন্দোলন কীভাবে স্বাধীনতার দিকে গিয়েছিল—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। লেখক নিজে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি ছিলেন। ফলে তিনি শুধু বাইরের ঘটনা লেখেননি- ভেতরের বৈঠক, নেতাদের মনোভাব, ভুল সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও তুলে ধরেছেন।
Thank you for reading this post, don’t forget to subscribe!এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এখানে শেখ মুজিবকে কেবল আবেগী জননেতা হিসেবে নয়, বরং অত্যন্ত হিসাবি, ধৈর্যশীল ও কৌশলী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখা যায়। তিনি একদিনে স্বাধীনতার ডাক দেননি। বরং এমন একটি রাজনৈতিক পথ তৈরি করেছিলেন, যেখানে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেরাই এমন অবস্থায় পৌঁছে যায় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনো বাস্তব পথ খোলা থাকে না।
নির্বাচনের আগেই শেখ মুজিবের কৌশল
১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল। অনেকেই ছয় দফাকে শুধু আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি মনে করেন। কিন্তু জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বর্ণনায় বোঝা যায়, ছয় দফা ছিল আসলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় কাঠামোকে ভেঙে ফেলার মতো একটি রাজনৈতিক পরিকল্পনা। এর মধ্যে ছিল—আলাদা মুদ্রানীতি, আলাদা অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, রাজস্বের উপর পূর্ব বাংলার অধিকার, পৃথক স্টেট ব্যাঙ্ক, পৃথক সেনাবাহিনী এবং প্রদেশের হাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা। অর্থাৎ, পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি থাকলেও বাস্তবে পূর্ব বাংলা অনেকটাই স্বাধীন হয়ে যেত।
শেখ মুজিব সরাসরি স্বাধীনতার কথা তখন বলেননি। কারণ তিনি জানতেন, খুব তাড়াতাড়ি স্বাধীনতার দাবি তুললে পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলো, সামরিক বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো তাঁর বিরুদ্ধে একজোট হয়ে যাবে। তাই তিনি প্রথমে এমন একটি দাবি তুললেন, যা গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক বলে মনে হয়, কিন্তু যার শেষ পরিণতি ছিল কার্যত স্বাধীনতা। এটি ছিল তাঁর প্রথম বড় কৌশল।
১৯৭০ সালের নির্বাচন: গণতন্ত্রকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার
জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর মতে, শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি পাকিস্তানের নিজের ঘোষিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৬০+৭+১৬৭ টি আসন পায়। অর্থাৎ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সাংবিধানিকভাবে শেখ মুজিবের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এখানেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সংকট শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক ও রাজনীতিবিদরা এতদিন ধরে ধরে নিয়েছিল যে, পূর্ব বাংলার মানুষ সংখ্যায় বেশি হলেও তারা কখনো কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারবে না। নির্বাচনের ফল সেই ধারণাকে ভেঙে দেয়।
শেখ মুজিব এই নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি অবস্থান তৈরি করেন, যেখানে তিনি আর শুধু পূর্ব বাংলার নেতা নন—তিনি পাকিস্তানের বৈধ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা। ফলে তাঁকে অস্বীকার করা মানে পাকিস্তানের নিজের সংবিধান, নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে অস্বীকার করা। জি. ডব্লিউ. চৌধুরী দেখিয়েছেন, এখানেই শেখ মুজিব পাকিস্তানকে নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেন।
ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর দ্বন্দ্বকে কাজে লাগানো
বইটিতে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোর সম্পর্ক। ভুট্টো জানতেন, শেখ মুজিব ক্ষমতায় গেলে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সংকুচিত হয়ে যাবে। তাই তিনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বয়কটের হুমকি দেন। তাঁর বিখ্যাত বক্তব্য ছিল—‘উধার তুম, ইধার হাম।’ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ, পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টি।
শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, ভুট্টো ও ইয়াহিয়া একে অপরকে ব্যবহার করলেও তাঁদের মধ্যে সম্পূর্ণ আস্থা নেই। তিনি এই দ্বন্দ্বকে নিজের পক্ষে কাজে লাগান। তিনি কখনো এমনভাবে আচরণ করেননি, যাতে তাঁকে সহজে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলা যায়। তিনি সবসময় বলেছেন—তিনি পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সমাধান চান, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের অধিকার দিতে হবে। এতে ভুট্টো ও ইয়াহিয়ার পক্ষে তাঁকে প্রকাশ্যে দেশদ্রোহী বলা কঠিন হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে শেখ মুজিব সময় নিচ্ছিলেন। তিনি জানতেন, যত সময় যাবে, তত পূর্ব বাংলার মানুষ আরও সংগঠিত হবে এবং পাকিস্তানি নেতৃত্বের আসল উদ্দেশ্যও মানুষের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
০১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ: পরিকল্পিত অসহযোগ আন্দোলন
০১ মার্চ ১৯৭১ সালে ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেন। এই সিদ্ধান্তই কার্যত পাকিস্তানের শেষের শুরু। জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বর্ণনায় দেখা যায়, এই মুহূর্তে শেখ মুজিব সঙ্গে সঙ্গে স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। বরং তিনি এমন এক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন, যা ছিল ইতিহাসের অন্যতম সফল রাজনৈতিক বিদ্রোহ।
তিনি সরকারি অফিস, আদালত, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবকিছু নিজের নির্দেশে চালাতে শুরু করেন। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সরকারের প্রশাসন ধীরে ধীরে অকার্যকর হয়ে যায়। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এখনো আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কারণ তিনি চেয়েছিলেন, বিশ্ব যেন দেখে—তিনি আলোচনার পথ খোলা রেখেছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানই সেই পথ বন্ধ করেছে।
এই সময় তাঁর নির্দেশ ছাড়া পূর্ব বাংলায় কিছুই চলছিল না। কর আদায়, অফিস খোলা, পরিবহন, এমনকি সরকারি কর্মচারীদের আচরণও তাঁর নির্দেশে নির্ধারিত হচ্ছিল। জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর মতে, মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়েই পূর্ব বাংলা কার্যত শেখ মুজিবের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পাকিস্তান নামমাত্র ছিল, কিন্তু ক্ষমতা ছিল তাঁর হাতে।
০৭ মার্চের ভাষণ: সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল
বইটির আলোকে ০৭ মার্চের ভাষণকে শুধু আবেগের ভাষণ হিসেবে দেখা যায় না। এটি ছিল একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম রাজনৈতিক কৌশল। শেখ মুজিব একদিকে মানুষকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করলেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে নিজেকে দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে তুলে ধরলেন।
তিনি সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি। কারণ তা করলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করত এবং আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশও তখন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়াতে পারত। আবার তিনি এমন ভাষাও ব্যবহার করেননি, যাতে আন্দোলন থেমে যায়।
তিনি এমন একটি অবস্থান নিলেন, যেখানে জনগণ বুঝে গেল—স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। কিন্তু বিশ্বের কাছে দেখা গেল—তিনি এখনো আলোচনার সুযোগ দিচ্ছেন। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই বাক্যটি তাই ছিল একদিকে জনগণের জন্য সংকেত, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য একটি সতর্কভাবে বেছে নেওয়া ভাষা।
আলোচনায় অংশ নেওয়া: সময় কেনার রাজনীতি
মার্চ মাসে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই মনে করেন, এই আলোচনা ছিল অর্থহীন। কিন্তু জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বই থেকে বোঝা যায়, শেখ মুজিব জানতেন যে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শেষ পর্যন্ত শক্তি প্রয়োগ করতে পারে। তবু তিনি আলোচনায় অংশ নেন। কেন?
কারণ তিনি সময় চাইছিলেন। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব বাংলার মানুষ সংগঠিত হয়েছে, প্রশাসন তাঁর নিয়ন্ত্রণে এসেছে, এবং বিশ্বমতও ধীরে ধীরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করেছে। যদি তিনি আলোচনায় না যেতেন, তাহলে পাকিস্তান সহজেই বলতে পারত—শেখ মুজিব আপস করতে চাননি। কিন্তু আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি সেই সুযোগ পাকিস্তানকে দেননি।
অন্যদিকে, আলোচনার আড়ালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। জি. ডব্লিউ. চৌধুরী দেখিয়েছেন, ইয়াহিয়া খান প্রকাশ্যে আলোচনা চালালেও গোপনে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। শেখ মুজিব হয়তো পুরো পরিকল্পনা জানতেন না, কিন্তু তিনি বুঝতে পারছিলেন যে পরিস্থিতি বিপজ্জনক দিকে যাচ্ছে। তাই তিনি প্রকাশ্যে শান্ত থাকলেও ভেতরে ভেতরে জনগণকে প্রস্তুত রাখছিলেন।
২৫ মার্চ ও শেখ মুজিবের শেষ সিদ্ধান্ত
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। এই মুহূর্তে শেখ মুজিবের সামনে দুটি পথ ছিল—তিনি পালিয়ে যেতে পারতেন, অথবা ঢাকায় থেকে গ্রেপ্তার হতে পারতেন।
জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর মতে, শেখ মুজিব ইচ্ছা করেই ঢাকায় থেকে যান। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর পালিয়ে যাওয়া পাকিস্তানি প্রচারণাকে শক্তিশালী করবে। তারা বলতে পারত—তিনি দেশ ভেঙে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু গ্রেপ্তার হয়ে তিনি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা দিলেন—তিনি জনগণকে ছেড়ে পালাননি।
একই সঙ্গে তাঁর গ্রেপ্তারই আন্তর্জাতিকভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনমত আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি গ্রেপ্তার হওয়ার আগে স্বাধীনতার বার্তা পাঠিয়ে দেন। ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতাও বজায় থাকে। পরে তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্যান্য নেতারা সেই ভিত্তির উপর অস্থায়ী সরকার গঠন করেন।
বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
জি. ডব্লিউ. চৌধুরীর বই থেকে সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—বাংলাদেশের স্বাধীনতা শুধু আবেগ, জনতার বিক্ষোভ বা আকস্মিক ঘটনার ফল ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রস্তুতি, ধৈর্য, সাংবিধানিক লড়াই, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফল।
শেখ মুজিবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি জানতেন কখন সরাসরি কথা বলতে হবে, কখন অস্পষ্ট থাকতে হবে, কখন আপসের ভাষা ব্যবহার করতে হবে, আর কখন জনগণকে চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। তিনি একদিকে পাকিস্তানের কাঠামোর ভেতরে নিজের নৈতিক অবস্থান বজায় রেখেছিলেন, অন্যদিকে সেই কাঠামোকেই এমনভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান নিজেই নিজের বৈধতা হারায়।
উপসংহার
‘The Last Days of United Pakistan’ বইটি পড়লে বোঝা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল না হঠাৎ কোনো বিচ্ছিন্নতার ঘটনা। বরং এটি ছিল পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থার ব্যর্থতার বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক জবাব। আর সেই জবাবের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।
শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি আন্দোলনের নেতা ছিলেন না। তিনি এমন একজন কৌশলী রাজনীতিক ছিলেন, যিনি গণতন্ত্র, নির্বাচন, অসহযোগ, আলোচনা, আন্তর্জাতিক জনমত এবং জনগণের আবেগ—সবকিছুকে একসঙ্গে ব্যবহার করে স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিলেন। পাকিস্তান তাঁকে থামাতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের নিজের ভুল এবং শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দূরদর্শিতাই বাংলাদেশকে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তানের ‘২০ দিনের প্রেসিডেন্ট’ মীর জাফরের বংশধর ইস্কান্দার মির্জা







