পরিচিতি ও অবস্থান
তুরী (Turi) একটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তুরীদের মূল বসবাস ভারত উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে। এদের প্রধানত দেখা যায় ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ এবং ঊড়িশ্যা অঞ্চলে। কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও সীমান্তবর্তী এলাকায় এদের উপস্থিতির উল্লেখ পাওয়া যায়, তবে তা খুবই সীমিত।
উৎপত্তি ও পরিচয়
তুরী জনগোষ্ঠীকে সাধারণত অস্ট্রো-এশিয়াটিক বা দ্রাবিড়ীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ধরা হয়। অনেক গবেষকের মতে, তারা প্রাচীন বনজীবী ও কারুশিল্পভিত্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত। তাদের সামাজিক পরিচয় অনেক সময় পেশাভিত্তিক—বিশেষ করে বাঁশ ও কাঠের কাজের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে।
ভাষা
তুরীদের নিজস্ব ভাষা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা আশেপাশের প্রচলিত ভাষা ব্যবহার করে, যেমন—হিন্দি, বাংলা বা আঞ্চলিক উপভাষা। তাদের ভাষা অনেকাংশে মৌখিক এবং লিখিত রূপ কম।
পেশা ও জীবিকা
তুরী জনগোষ্ঠীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা- বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র (ঝুড়ি, ডালা, খাঁচা ইত্যাদি) তৈরি। এছাড়া কাঠের হস্তশিল্প, কৃষিকাজ ও দিনমজুরি ইত্যাদি।
গ্রামবাংলার জীবনে তাদের তৈরি জিনিস একসময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে আধুনিক প্লাস্টিক ও কারখানার পণ্যের কারণে এই পেশা এখন হুমকির মুখে।
সামাজিক জীবন ও সংস্কৃতি
তুরী সমাজ সাধারণত পরিবারকেন্দ্রিক এবং গ্রামভিত্তিক। তাদের মধ্যে—বিয়ে সাধারণত নিজ গোষ্ঠীর মধ্যে। সামাজিক সিদ্ধান্ত নেয় গ্রামের প্রবীণরা। উৎসবগুলো প্রকৃতি ও কৃষির সঙ্গে সম্পর্কিত।
তাদের সংস্কৃতিতে গান, নাচ ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রভাব রয়েছে, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে।
ধর্ম ও বিশ্বাস
তুরীরা সাধারণত প্রকৃতি পূজারী। তারা বন, পাহাড়, নদী ও পূর্বপুরুষের আত্মাকে সম্মান করে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও গ্রহণ করেছে।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে তুরী জনগোষ্ঠী নানা সমস্যার সম্মুখীন। অর্থনৈতিক দুর্বলতা, শিক্ষার অভাব, ঐতিহ্যবাহী পেশার অবমূল্যায়ন এবং আধুনিক সমাজে পরিচয় সংকট রয়ে গেছে।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে তাদের উন্নয়নের চেষ্টা থাকলেও তা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বর্তমানের সঙ্গে যোগ
একসময় গ্রামের হাটে গেলে দেখা যেত—একজন তুরী কারিগর তার হাতে তৈরি বাঁশের ঝুড়ি বিক্রি করছেন। সেই ঝুড়ি ছাড়া কৃষকের কাজই চলতো না। কিন্তু আজ সেই জায়গায় প্লাস্টিকের পণ্য দখল করে নিয়েছে বাজার।
এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি একটি সংস্কৃতির ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। তুরী জনগোষ্ঠী আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন মানেই সবসময় অগ্রগতি নয়; কখনো কখনো তা ঐতিহ্য হারানোরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমান বিশ্বে যখন টেকসই জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা বাড়ছে, তখন তুরীদের মতো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান আবার নতুনভাবে মূল্যায়নের দাবি রাখে। তাদের সংরক্ষণ মানে শুধু একটি জনগোষ্ঠীকে বাঁচানো নয়—বরং একটি প্রাচীন জ্ঞান ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা।







Leave a Reply