ঝিনাইদহ জেলার একটি অদ্ভুত জনপদের গল্প লোকমুখে বহুদিন ধরে ঘুরে বেড়ায়। জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার এলাঙ্গী এলাকার কাছে অবস্থিত ছোট একটি গ্রাম—মঙ্গলপুর—যাকে অনেকেই “পরিত্যক্ত গ্রাম” বলে উল্লেখ করেন। স্থানীয় বয়স্ক মানুষেরা বলেন, একসময় এটি ছিল স্বাভাবিক একটি গ্রাম, যেখানে কৃষিজীবী পরিবার, ছোট দোকান, পুকুর, গাছপালা এবং গ্রামীণ জীবনের সাধারণ সব চিত্র ছিল। ধান-পাটের চাষ, গরু-ছাগল পালন, মৌসুমি হাট—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ বাংলার গ্রামের মতোই ছিল মঙ্গলপুরের জীবনযাত্রা। কিন্তু ধীরে ধীরে এমন এক ঘটনা ঘটে, যার ফলে পুরো গ্রামটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে এবং বহু বছর ধরে এটি মানুষের বসবাসহীন অবস্থায় পড়ে থাকে।
স্থানীয় ইতিহাস ও লোককথা অনুযায়ী, বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এই এলাকায় একটি ভয়াবহ মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয় এটি ছিল কলেরা বা অনুরূপ কোনো সংক্রামক রোগ, যা সেই সময় গ্রামীণ এলাকায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তো। চিকিৎসা ব্যবস্থা তখন খুব সীমিত ছিল, আর গ্রামবাসীরাও রোগের প্রকৃতি সম্পর্কে খুব বেশি জানতেন না। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়তো এবং অনেকের মৃত্যু ঘটতো।
এই মৃত্যুগুলো এতো দ্রুত ঘটতো যে গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তো। এই পরিস্থিতিতে মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে এই গ্রামে থাকা নিরাপদ নয়। কেউ কেউ মনে করতো গ্রামটি অভিশপ্ত হয়ে গেছে, আবার কেউ ভাবতো এখানে কোনো অশুভ প্রভাব নেমে এসেছে। এই ভয় এবং অনিশ্চয়তার কারণে পরিবারগুলো একে একে গ্রাম ছেড়ে আশেপাশের অন্য গ্রাম বা দূরের এলাকায় চলে যেতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে মঙ্গলপুরের বাড়িগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। যেসব কাঁচা বা আধাপাকা ঘর ছিল, সেগুলো সময়ের সাথে ভেঙে পড়ে বা গাছপালায় ঢেকে যায়। পুকুরগুলো জঙ্গল আর শেওলায় ভরে ওঠে। বাড়ির আঙিনায় জন্মায় বুনো গাছপালা। মানুষের পদচারণা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পুরো এলাকাটি অনেকটা নির্জন হয়ে পড়ে। দিনের বেলায়ও সেখানে এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করতো, আর সন্ধ্যার পর স্থানীয় লোকজন খুব একটা সেখানে যেতো না।
মঙ্গলপুর গ্রামের একটি দৃশ্য

সময়ের সাথে সাথে এই জনশূন্য গ্রামকে ঘিরে নানা গল্প ও কল্পকাহিনীও তৈরি হয়। অনেকে বলতো রাতে সেখানে অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়। কেউ কেউ দাবি করতো দূর থেকে আলো বা ছায়া দেখা যায়। এসব গল্পের সত্যতা প্রমাণ করা না গেলেও, এগুলো গ্রামটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে এবং দীর্ঘদিন ধরে মানুষ সেখানে বসবাস করতে আগ্রহ দেখায়নি।
বছরের পর বছর ধরে মঙ্গলপুর প্রায় জনশূন্য অবস্থায় পড়ে থাকে। জমিগুলো অনেকাংশে অনাবাদী হয়ে যায়, আবার কিছু জমি আশেপাশের গ্রামের মানুষ মাঝে মাঝে চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করতো। তবে স্থায়ীভাবে বসবাস করার সাহস খুব কম মানুষই দেখিয়েছিল। ফলে প্রায় শতাব্দীর কাছাকাছি সময় ধরে এই গ্রামটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ইতিহাসে এক অদ্ভুত উদাহরণ হয়ে আছে। প্রায় ৮০-১০০ বছর ধরে এই গ্রামটি কার্যত জনশূন্য অবস্থায় ছিল।
একটি জনপদ যেখানে প্রকৃতি আছে, জমি আছে, পুকুর আছে, কিন্তু মানুষের স্থায়ী বসতি দীর্ঘদিন ছিল না। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে কিছু পরিবারকে সেখানে বসবাসের জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে এবং ধীরে ধীরে এলাকাটিতে মানুষের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিছু আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি পরিবারকে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তবুও এলাকাটি এখনো অনেকটাই নির্জন এবং রহস্যময় বলে মনে করা হয়।
মঙ্গলপুর গ্রামের সরকারি গৃহায়ন প্রকল্প

মঙ্গলপুরের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ইতিহাস সবসময় বড় বড় যুদ্ধ বা রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনও কখনও একটি ছোট মহামারি, একটি সামাজিক আতঙ্ক বা মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসও একটি পুরো জনপদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। আজ যখন এই গ্রামটির কথা বলা হয়, তখন এটি কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের স্মৃতি, ভয়, লোককথা এবং সময়ের পরিবর্তনের একটি জীবন্ত উদাহরণ।
অনেকের কাছে এটি বাংলাদেশের এক রহস্যময় পরিত্যক্ত গ্রামের ইতিহাস, আবার কারও কাছে এটি কেবল অতীতের একটি অধ্যায়। এতে দেখা যায় কীভাবে মানুষের অনুপস্থিতিতেও প্রকৃতি ধীরে ধীরে একটি জনপদকে নিজের মতো করে ঢেকে ফেলে।
আরও পড়ুনঃ একটি গ্রাম যেখানে একই দিনে মারা যায় গ্রামের সব লোক







Leave a Reply