বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু সামরিক লড়াই ছিলো না; এটি ছি্লো বুদ্ধি, বিবেক ও নৈতিক অবস্থানের এক গভীর সংগ্রাম। এই সংগ্রামে যাঁরা অস্ত্র হাতে নেননি, কিন্তু নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সাহস দিয়ে স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছিলেন—তাঁদের অনেকেই ইতিহাসে তুলনামূলকভাবে নীরব হয়ে আছেন। শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম নূরুল হক তেমনই এক নিঃশব্দ কারিগর।
একাত্তরে এ কে এম নূরুল হক ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান বেতার বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী। তাঁর কর্মস্থল ছিলো ঢাকার মহাখালীর ওয়্যারলেস ক্যাম্পাস। ২৯ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে সরকারি বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর আর কোনো দিন তিনি ফিরে আসেননি। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, তাঁকে নির্যাতনের পর হত্যা করে অজ্ঞাত গণকবরে মাটিচাপা দেওয়া হয়। তাঁর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের এক প্রাথমিক ও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
এ কে এম নূরুল হকের অবস্থান কেবল পেশাগত দায়িত্বে সীমাবদ্ধ ছিলো না। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘তমঘা-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব পরিত্যাগ করেন—যা তাঁর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে। এই সিদ্ধান্ত ছিলো একদিকে ব্যক্তিগত ঝুঁকিপূর্ণ, অন্যদিকে প্রতীকী প্রতিবাদ।
তাঁর ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দাবি হলো—২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারে তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হতে না পারলেও অধীনস্থ সহকারী প্রকৌশলীর সহায়তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ ওই রাতের সম্প্রচার শনাক্ত করে তাঁকে আটক করে—এমন ধারণা ইতিহাসে শক্ত ভিত্তি পেয়েছে।
এই বিষয়ে বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাক্ষ্য পাওয়া যায়। সাবেক সচিব নূরুদ্দিন আহমদ তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, এ কে এম নূরুল হক ও তাঁর সহকর্মী লোকমান হোসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। লোকমান হোসেন দীর্ঘ বন্দিত্বের পর বেঁচে ফিরলেও নূরুল হক আর ফেরেননি। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামও তাঁর লেখায় ২৫ মার্চ দুপুরে নূরুল হকের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন এবং খুলনা থেকে আনা ট্রান্সমিটার সংক্রান্ত আলোচনা তুলে ধরেছেন।
তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদের গ্রন্থে হাজি গোলাম মোর্শেদের সাক্ষাৎকারও এই ধারাবাহিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। সেখানে বঙ্গবন্ধু নুরুল হকের কাছে নির্দেশ পাঠান, বার্তা পাঠানো শেষে যন্ত্রটি ধ্বংস করে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয় তাকে, কিন্তু তবুও শেষরক্ষা হয়নি তার। হয়তো যথাসময়ে কিংবা যথাযথভাবে আত্মগোপনে যেতে পারেননি তিনি।
এসব বর্ণনা একত্রে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়—এ কে এম নূরুল হক স্বাধীনতার ঘোষণার প্রযুক্তিগত প্রস্তুতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পেশাগত জীবনে নূরুল হক ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ ও উদ্ভাবনী প্রকৌশলী। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান পর্ব পর্যন্ত রেডিও টেলিকমিউনিকেশন খাতে তাঁর অবদান রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ, হরিপুর স্টাফ কলেজে যন্ত্রপাতি ডিজাইন—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্রেরই তৈরি এক সম্পদ। কিন্তু সেই সম্পদ যখন বাঙালির অধিকারের প্রশ্নে দাঁড়ালো, তখন রাষ্ট্র তাঁকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করলো। এখানেই একাত্তরের নির্মম বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়।
এ কে এম নূরুল হকের জীবন ও মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু সম্মুখসমরের গল্প নয়। এটি প্রযুক্তিবিদ, প্রকৌশলী, প্রশাসক ও বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের সমষ্টিগত ইতিহাস। তাঁর মতো মানুষরা না থাকলে স্বাধীনতার ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারতো।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে অনেক আনুষ্ঠানিকতা হয়, এ কে এম নূরুল হকের নাম উচ্চারিত হয়, কিন্তু কয়জন ভালোমতো জানেন তাঁর অবদানের ক্ষেত্র কি ছিলো। তাঁর অবদান এখনও পূর্ণাঙ্গভাবে আলোচিত নয়।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করা—এবং স্মরণ করিয়ে দেয়া যে স্বাধীনতার উদয়ের পথে কিছু কণ্ঠ ছিল, যারা শব্দের আগেই জীবন দিয়ে গেছে। অথচ, অনেককেই শব্দ সৈনিকদের মুক্তিযোদ্ধার সম্মান দিতে দ্বিমত পোষণ করতে দেখা যায়।
শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম নূরুল হকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
আরও পড়ুনঃ
(১) বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘Prodigal Don’: তারেক রহমানকে যেভাবে দেখছে টাইম ম্যাগাজিন








Leave a Reply