| পিনাকী ভট্টাচার্য |
“কারো ব্যক্তিগত চরিত্র বা কলুষিত জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করা আমার পছন্দ না। সবাই শ্রষ্টার সৃষ্টি। কিন্তু দেশের বর্তমান দুরবস্থার
সময়ে ২০১২ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে সাংবাদিক
আমানুল্লাহ খানের একটি লেখার স্ক্রিনশট দুইদিন যাবৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে
দেখে লেখাটির প্রতি একটু নজর কাড়লো।
করে লেখা, সে ব্যক্তির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এতোটাই নিকৃষ্ট যে, তার দুর্নীতির কারনে
এদেশে ২৭৯ জন শিশুর অপমৃত্যু হয়। বর্তমানেও সে মানবতা বিরোধী নানা কার্যকলাপে সক্রিয়।
তাই আগ্রহ নিয়ে লেখাটা পড়লাম। কিন্তু আমার মতো যাদের চোখের পাওয়ার কমে গেছে তাদের
পড়তে যাতে অসুবিধা না হয়, কষ্ট করে পড়া অসুবিধার কথা চিন্তা করে যাতে পড়া ক্ষ্যান্ত না দেয়, সেজন্যে
লেখাটির প্রতিলিপি উদ্ধার করে প্রকাশ করলাম। বিখ্যাত ইউটিউবার পিনাকী ভট্টাচার্যের
জন্ম যে একজন পাকিস্তানির ঔরসে, সেই করুন ইতিহাস নিচের লেখটি পড়লে বুঝতে পারবেন।”
আগস্ট বগুড়ার জলেশ্বরীতলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৭ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে মেট্রিক
পাস করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি প্রকৌশল নিয়ে ডিপ্লোমা পাশ করেন ঢাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
থেকে। এর পরে প্রকৌশলী হিসাবে কিছুদিন সরকারি চাকরিও করেন। একজন শিক্ষক, নাট্যকার এবং
মানুষের পথপ্রদর্শক আমার প্রিয় শ্যামল ভট্টাচার্য দা।
আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। শ্যামল ভট্টাচার্য বগুড়া জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসেবে জ্ঞানের
আলো ছড়িয়ে গেছেন সারা জীবন। শিক্ষকতা জীবন শেষ করেও নিজের টাকায় বই বিতরণ করে শিক্ষা
বিস্তারে রেখেছেন অনন্য ভূমিকা।
মানুষ ছিলেন আমাদের শ্যামল দা। লেখক হিসেবেও তার ব্যপক খাতি, কিন্তু বাক্তি জীবনে ছিলেন
অসুখী, তাই সর্বস্ব বিলিয়ে যাচ্ছেন মানব কল্যাণে। মৃত্যু পরবর্তী সময়ে নিজের দেহও দান
করে যেতে চান মেডিকেল কলেজে, যাতে মেডিকেল এর শিক্ষার্থীরা দেহ ব্যবচ্ছেদ করে শিখতে
পারে।
উপলক্ষ্যে, কিছু বিস্মৃত স্মৃতি লিখতে বসেছি।“
জয়েন করেন পাকিস্তানের লাহোর নিবাসী সোয়েব আব্দুল্লাহ। ফর্সা, লম্বা চওড়া উঁচু গড়নের
সুদর্শন এসডিইও সাহেব বগুড়া বাসীর কাছে খুবই প্রিয় ছিলেন। এসডিইও সাহেব ছিলেন সংস্কৃতি
মনা। এসডিইও সাহেব বিভিন্ন স্কুলে পরিদর্শন করলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আয়োজন করতো সাংস্কৃতিক
অনুষ্ঠানের। এসডিইও সাহেব নিজেও পারফর্ম করতেন, গান গাইতেন, আবৃতি করতেন। ১৯৬৬ সালের
জানুয়ারি মাসে বগুড়া জেলা স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে
প্রধান অতিথি হিসেবে আসেন এসডিইও সাহেব। দারুন পারফর্মার তখনকার তরুন নাট্য নির্দেশক
শ্যামল ভট্টাচার্য দার সাথে এসডিইও সাহেবের পরিচয় হয় তখনই। বন্ধুবৎসল শ্যামল দার সাথে
এসডিইও সাহেবের সম্পর্ক গড়ায় পারিবারিক পর্যায়ে। শ্যামল দার বাসায় প্রায়ই আসতেন এসডিইও
সাহেব। আমিও যেতাম। সাংস্কৃতিক আলোচনায় জম্পেশ চায়ের আড্ডা দিতাম শ্যামল দার বাসায়।
একদিন এসডিইও সাহেব শ্যামল দাকে বললেন, জাতি গঠনে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে। মানবপ্রেমী
শ্যামল দাও রাজি হলেন। এসডিইও সাহেব বগুড়া জেলা স্কুলে শ্যামল দার চাকরির ব্যবস্থা
করবেন বলে আশ্বাস দেন। শ্যমল দা এসডিইও সহেব এর অনুরোধে সরকারি চাকুরী ছেড়ে শিক্ষা
প্রশিক্ষণ কোর্স করতে ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় চলে যান ৬ মাসের
প্রশিক্ষণে। মহাপ্রাণ এসডিইও সাহেব ভর্তি ও থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। জুন মাসে সুক্রিতি
বৌদির চিঠি মারফত জানতে পারেন শ্যামল দা বাবা হতে যাচ্ছেন। বৌদির চিঠি পেয়ে আনন্দের
আর সীমা ধরে না শ্যামল দার, বগুড়া ফিরে আসার জন্য উনি উতলা হয়ে উঠেন। প্রিন্সিপাল এর
কাছ থেকে ছুটির প্রার্থনা করেও ছুটি জুটলো না, সুক্রিতি বৌদিকে চিঠিতে
জানালেন সেই কষ্টের কথা। প্রশিক্ষণ শেষে বগুড়া ফিরলেন
আগস্ট মাসে। ফিরার পরপরই শ্যামল দাকে এসডিইও সাহব বগুড়া জিলা স্কুলে শিক্ষক হিসাবে
জয়েন করার কথা বলেন। শ্যামল দা সুক্রিতি বৌদির শুশ্রূষার কথা চিন্তা করে সেই সময় যোগদান
করেননি, সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর যোগদান করবেন বলে এসডিইও সাহবেকে জানান।
এদিকে ১৯৬৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারী থেকে
এসডিইও সাহেব কিশোরগঞ্জে বদলী হয়ে যাচ্ছেন জেনে অগত্যা জানুয়ারী মাসে সন্তান জন্মগ্রহণ
না করা সত্বেও শিক্ষকতার চাকুরীতে যোগদান করেন ১৯৬৭ সালের ১৬ জানুয়ারি।
ডিসেম্বর-জানুয়ারিতেও সুক্রিতি বৌদির
সন্তান জন্মগ্রহণ না করাতে শ্যামল দার সন্দেহের তীর বাঁকে আমার দিকে।
কথায় চাল চলনে তা আমি স্পষ্ট বুঝতে
পারছিলাম। বুঝলেও না বুঝার ভাব ধরে থাকতাম। জানুয়ারী মাস থেকেই তার ব্যক্তি জীবনের
অশান্তির শুরু। সন্দেহের দানা বড় হতে থাকে ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে, সুক্রিতি
বৌদির সাথে প্রতিদিনই ঝগড়া ঝাটি হতো তখন। বৌদিকে পাঠিয়ে দেন বৌদির বাপের বাড়ি। ১৯৬৭
সালের মার্চের প্রথম দিকে সুক্রিতি বৌদির প্রথম পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। রাগে ক্ষোভে
প্রথম সন্তানের মুখ পর্যন্ত দেখতে যাননি শান্ত সরল শ্যামল দা। পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে
লোকলজ্জার ভয়ে ৩ মাস পরে, সুক্রিতি বৌদিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
আমরা সমবয়সী, শ্যামল দার সাথে আমার
সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো, অনেক ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন আমাকে। দুঃখ সুখের সকল প্রানের
কথাই বলতেন আমার সাথে। শ্যামল দা দীর্ঘ এক বছর কথা বলেননি আমার সাথে। সাংস্কৃতি প্রেমী
এসডিইও সাহের কতই না ভাল ছিলেন শ্যামল দার কাছে। সুক্রিতি বৌদি অনেক পরে স্বীকার করেছিলেন
শ্যমল দার কাছে কিভাবে এসডিইও সাহেব বৌদিকে জোর পূর্বক ধর্ষণ করেছিলেন শ্যামল দার প্রশিক্ষণে যাওয়ার
একমাসের মধ্যেই, লজ্জায় ভয়ে তখন শ্যামল দাকে জানাননি, অনেক চেষ্টা করেছেন এ সন্তান
নষ্ট করতে কিন্তু সফল হননি। আমার প্রতি সন্দেহের তীরও কেটে যায় সুক্রিতি বৌদির শিশুসুলভ
স্বীকারোক্তিতে। আমিও হাফ ছেড়ে বাঁচি, শ্যামল দার সাথে কথা বলা, বন্ধুত্ব আবারও শুরু
হয়।
শ্যামল দার সেই ছেলে আজ ডাক্তার হয়েছে,
লেখক হয়েছে, সাম্যবাদী হয়েছে। নিজের মতো করেই গড়ে তুলেছেন শ্যামল দা। নিজের ঔরসজাত
সন্তান নয় এমনটা জেনেও শিশু পিনাকীকে একটুও কষ্ট দেননি, বুঝতে দেননি। এমন সাদা মনের
মানুষ কজন আছে পৃথিবীতে? যদিও সেই ১৯৬৭ সাল থেকেই শ্যামল ভট্টাচার্য দাদা মানষিক অশান্তিতে
ভুগেছেন, হয়তো ভুগবেন আমৃত্যু বদি।
দা’কে অগনিত সাদা গোলাপের শুভেচ্ছা।
![]() |
| দৈনিক ইত্তেফাকের স্ক্রিনশট |








