অপরিচিত ধর্মের আলোকে – ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহ (দ্রুজ ধর্ম)

মানবসভ্যতার
ইতিহাসে ধর্ম এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজকের পৃথিবীতে ইসলাম, খ্রিষ্টান, ইহুদি,
হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানে। এ ছাড়াও এমন কিছু প্রাচীন ধর্ম
আছে, যেগুলো ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেললেও সাধারণ মানুষের কাছে তা অনেকটাই অপরিচিত। এই
পর্বে আলোচনা করবো দ্রুজ ধর্ম সম্পর্কে।

 

দ্রুজ ধর্ম: উৎপত্তি ও ইতিহাস

দ্রুজ ধর্মের
উৎপত্তি ১১শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ফাতেমীয় খিলাফতের সময় মিশরে। তখনকার খলিফা আল-হাকিম
বি-আমর আল্লাহ
(৯৮৫–১০২১ খ্রিঃ) কে কেন্দ্র করে এই ধর্মীয় ধারা গড়ে ওঠে। আল-হাকিমের
সমর্থক হামজা ইবনে আলী এবং অন্যান্য নেতারা প্রচার করতে থাকেন যে আল-হাকিম কেবল খলিফা
নন, তিনি আল্লাহর এক বিশেষ অবতার বা প্রকাশ।

১০৪৩ সালের
দিকে দ্রুজরা ঘোষণা দেয় যে তাদের ধর্ম প্রচারকাজ (দা’ওয়াহ) সম্পূর্ণ হয়েছে। এরপর থেকে
এটি একটি বন্ধ সম্প্রদায় হয়ে যায়। অর্থাৎ, নতুন কেউ বাইরে থেকে দ্রুজ ধর্মে
প্রবেশ করতে পারে না।

 

ধর্মগ্রন্থ ও বিশ্বাস

দ্রুজদের ধর্মীয়
গ্রন্থ হলো রাসাইল আল-হিকমাহ (Letters of Wisdom)।
তাদের মূল বিশ্বাসগুলোর মধ্যে রয়েছে—

(১) আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়, কিন্তু তিনি ইতিহাসে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত
হতে পারেন।

(২) আত্মার পুনর্জন্মে বিশ্বাস—প্রত্যেক দ্রুজ মৃত্যুর পর নতুন
দেহে জন্মগ্রহণ করে।

(৩) সত্য ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের জন্য নয়; কেবল নির্বাচিতরা
গভীর রহস্য বুঝতে পারে।

(৪) ন্যায়, সততা, আনুগত্য ও জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা তাদের মূল নৈতিক
মূল্যবোধ।

 

উপাসনা ও ধর্মীয় প্রথা

(১) দ্রুজদের কোনো মসজিদ বা গির্জার মতো প্রকাশ্য উপাসনালয় নেই,
বরং তারা ছোট ছোট প্রার্থনাস্থল বা “খিলওয়াহ” ব্যবহার করে।

(২) তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান গোপনীয়, সাধারণ জনগণের মধ্যে তা প্রচলিত
নয়।

(৩) বাইরে থেকে দ্রুজদের সাধারণত মুসলিম বা খ্রিস্টানদের মতো আলাদা
করে চেনা কঠিন, কারণ তাদের সংস্কৃতি স্থানীয় সমাজের সাথে মিশে থাকে।

 

দ্রুজ ধর্মের বর্তমান অবস্থা

আজকের দিনে
প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ দ্রুজ জীবিত আছেন, যাদের অধিকাংশ বাস করে—

    (১) লেবানন

    (২) সিরিয়া

    (৩) ইসরায়েল

    (৪) জর্ডান

 

ইসরায়েলে দ্রুজরা
সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, আবার সিরিয়া ও লেবাননে তারা শক্তিশালী সামাজিক
গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। তবে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে তারা রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থকে
বেশি গুরুত্ব দেয়।

 

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

দ্রুজরা একটি
রহস্যময় এক অনন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়, যারা নিজেদের ঐতিহ্য বহির্বিশ্ব থেকে গোপন রেখেছে।
অনেক গবেষক মনে করেন, তাদের মধ্যে ইসলামের ইসমাইলি ধারার প্রভাব যেমন আছে, তেমনি গ্রিক
দর্শন, হিন্দু ও গনোস্টিক চিন্তাধারারও প্রভাব রয়েছে।

আগের পর্বঃ অপরিচিত ধর্মের আলোকে – পর্ব ২: ইব্রাহিমীয় ধর্মসমূহ (বাহাই ধর্ম)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top