বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতিকে “মহামান্য” এবং মন্ত্রীদের “মাননীয়” বলে সম্বোধনের দীর্ঘদিনের রেওয়াজ রয়েছে। এটি কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
“মহামান্য” শব্দটি কেন কেবল শব্দ নয়
রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিটি শব্দের একটি অর্থ আছে। বিশেষ করে যখন সেই শব্দ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদকে ঘিরে।
আমাদের অনেকেরই হয়তো মনে আছে, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর আমলে একটি প্রশাসনিক আদেশ জারি হয়েছিলো। তাতে রাষ্ট্রপতিকে “মহামান্য” এবং মন্ত্রীদের “মাননীয়” বলে সম্বোধনের বিষয়ে বলা হয়েছিলো। মন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো পদবিতে “মাননীয়” ব্যবহারের কথা সেখানে ছিলো না।
অবশ্যই সেই আদেশ এখনও কার্যকর আছে এবং যদি থাকে, তবে তা অনুসরণ করা প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা।
শপথ অনুষ্ঠানে প্রটোকল লঙ্ঘন?
১৩ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানের মতো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিকে একবারও “মহামান্য” বলা হয়নি। বরং “রাষ্ট্রপতি মহোদয়” ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ কেউ একে তুচ্ছ ভাষাগত পরিবর্তন বলতে পারেন। কারণ এ জাতীয় সম্বোধন আজকাল একজন উচ্চপদস্থ ব্যাক্তিও তার অধস্তনদের প্রতি সম্মান প্রকাশ স্বরূপ বলে থাকেন – যদিও অনেকের কাছেই সেটা দৃষ্টিকটু। কারণ, একজন মন্ত্রী যদি একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসার কিংবা জেলা প্রশাসকে ‘মহোদয়’ সম্বোধন করেন তখন তা দৃষ্টিকটু বৈ কি?
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি ব্যক্তিগত শব্দচয়ন, নাকি পূর্বনির্ধারিত স্ক্রিপ্ট?
রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠান কোনো তাৎক্ষণিক বক্তৃতা নয়। এটি লিখিত স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সেই স্ক্রিপ্ট প্রস্তুত ও অনুমোদনের দায়িত্ব প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে পড়ে। সুতরাং বিষয়টি নিছক জিভ ফসকে যাওয়া নয়—এটি কাঠামোগত সিদ্ধান্ত।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়
১৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি – যিনি ১৬ তারিখেই ওই পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি প্রশাসনিক প্রটোকলের রক্ষক। রাষ্ট্রীয় সম্বোধনের যথার্থতা নিশ্চিত করা, অনুমোদিত ভাষা ও ফরম্যাট অনুসরণ করা, সংবিধান ও প্রচলিত প্রশাসনিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা একজন সর্বোচ্চ সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব।
যদি নির্ধারিত সম্বোধন ইচ্ছাকৃতভাবে পরিহার করা হয়ে থাকে, তবে সেটি প্রশাসনিক বিচ্যুতি।
যদি ভুলবশত হয়ে থাকে, তবে সেটিও গুরুতর অবহেলা।
উভয় ক্ষেত্রেই প্রশ্ন ওঠে—কেনো ঘটলো?
প্রশাসনিক জবাবদিহিতা কি থাকবে?
নতুন নির্বাচিত সরকার কি এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইবে?
একটি স্বচ্ছ প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে এ ধরনের ঘটনার তিনটি ধাপ থাকা উচিত—
১। প্রাথমিক যাচাই — প্রটোকল অনুযায়ী কী বলা বাধ্যতামূলক ছিল?
২। দায় নির্ধারণ — স্ক্রিপ্ট কারা প্রস্তুত করেছে এবং অনুমোদন দিয়েছে?
৩। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা — ভবিষ্যতে যেন এমন বিচ্যুতি না ঘটে তা নিশ্চিত করা
এটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন।
রাষ্ট্র বনাম ব্যক্তি: গভীরতর সংকট
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা রয়েছে—প্রতিষ্ঠান দুর্বল, ব্যক্তি শক্তিশালী। কখনো দল রাষ্ট্রের ওপরে উঠে যায়, কখনো প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিজেদের অবস্থানকে রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেন।
কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শন ছিল ভিন্ন। এখানে আইন, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ঊর্ধ্বে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি ব্যক্তি নন; তিনি রাষ্ট্রের প্রতীক। তার সম্বোধনের ধরন যদি প্রশাসনের ইচ্ছানির্ভর হয়ে যায়, তবে সেটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার ক্ষয়।
নতুন প্রধানমন্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় তার সম্বোধন সৌজন্যবশত পরিত্যাগের কথা বলেও থাকেন। সরকারি কর্মকর্তারা কি তা পরিত্যাগ করতে পারেন – যদি সরকারিভাবে অফিসিয়াল আদেশ না হয়।
অন্তর্বর্তী শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শিথিলতা
সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে বিতর্ক ছিল। বৈধতা ও সাংবিধানিকতার প্রশ্নও উঠেছিল। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা শিথিল হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব হলো সেই শিথিলতা বন্ধ করা, প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা পুনরুদ্ধার করা।
যদি নতুন সরকারও বিষয়টি এড়িয়ে যায়, তবে বার্তাটি হবে পরিষ্কার—
প্রটোকল আর বাধ্যতামূলক নয়; এটি পরিস্থিতিনির্ভর।
কেন তদন্ত প্রয়োজন?
তদন্ত মানে শাস্তি দেওয়া নয়। তদন্ত মানে—
(১) প্রটোকল স্পষ্ট করা
(২) ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দূর করা
(৩) প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা
আজ “মহামান্য” বাদ গেছে। কাল অন্য সাংবিধানিক পদে অনুরূপ বিচ্যুতি ঘটতে পারে। রাষ্ট্রের মর্যাদা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয় ছোট ছোট উদাহরণ দিয়ে।
শেষ কথা
এই প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির সম্মান নিয়ে নয়। এটি রাষ্ট্রের সম্মান নিয়ে।
এটি রাজনৈতিক বিরোধ নয়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন।
রাষ্ট্র বড়, ব্যক্তি নয়।
সংবিধান বড়, ক্ষমতাসীন নয়।
প্রতিষ্ঠান বড়, প্রশাসনিক সুবিধাবাদ নয়।
নতুন সরকার যদি সত্যিই প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্র গঠনে বিশ্বাস করে, তবে এই ঘটনার ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনে তদন্ত নিশ্চিত করা উচিত।
কারণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা রক্ষা হয় শুধু বড় সিদ্ধান্তে নয়—শব্দের মধ্য দিয়েও।
আরও পড়ুনঃ তিন উপদেষ্টা ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন—এটি কি কেবল গুজব, নাকি রাজনৈতিক প্রকল্প?






Leave a Reply