সাঁওতালরা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠী। তারা মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে, বিশেষ করে দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, ঠাকুরগাঁও এবং আশপাশের এলাকায়।
বাংলাদেশ ছাড়াও সাঁওতালরা ভারতের ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, উড়িশ্যা প্রভৃতি অঞ্চলে ব্যাপকভাবে বসবাস করে।
আগমন ও উৎপত্তি
(১) সাঁওতালরা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাপরিবারভুক্ত মুণ্ডা (Munda) শাখার জনগোষ্ঠী।
(২) তাদের আদি আবাস ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চল বলে গবেষকরা মনে করেন।
(৩) ব্রিটিশ আমলে চা-বাগান, রেললাইন ও কৃষিকাজে শ্রমের জন্য বহু সাঁওতাল বর্তমান বাংলাদেশে আসে।
(৪) ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহ তাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ভাষা
(১) তাদের ভাষার নাম সাঁওতালি (Santali)।
(২) ভাষাটি অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।
(৩) সাঁওতালি ভাষার নিজস্ব লিপি হলো Ol Chiki, যা ২০শ শতকে প্রবর্তিত হয়।
(৪) বর্তমানে অনেক সাঁওতাল বাংলা ভাষাও ব্যবহার করে।
ধর্ম ও বিশ্বাস
ঐতিহ্যগতভাবে সাঁওতালরা প্রকৃতিপূজারী (Sarna ধর্ম)।
(১) তারা প্রকৃতি, বন, পাহাড় ও পূর্বপুরুষের আত্মাকে পূজা করে।
(২) গ্রামের উপাসনাস্থলকে “জাহের থান” বলা হয়।
বর্তমানে—
(৩) অনেকেই খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে।
(৪) কিছু সাঁওতাল হিন্দুধর্মও অনুসরণ করে।
জীবনযাপন ও অর্থনীতি
(১) প্রধান পেশা কৃষিকাজ।
(২) ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদি চাষ করে।
(৩) অনেকেই দিনমজুরি, ইটভাটা বা কারখানায় কাজ করে।
(৪) মাটির তৈরি ঘর ও খড়ের ছাউনি তাদের ঐতিহ্যবাহী বাসস্থান।
পোশাক ও সংস্কৃতি
(১) নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক “পঁচি” ও “পরহান” নামে পরিচিত।
(২) পুরুষরা ধুতি-সদৃশ পোশাক পরে।
(৩) সাঁওতাল নৃত্য ও সংগীত অত্যন্ত প্রাণবন্ত ও সমবেতধর্মী।
(৪) প্রধান বাদ্যযন্ত্র: মাদল (ঢোল)।
উৎসব
(১) সোহরাই (ফসল উৎসব)
(২) বাহা উৎসব (ফুল উৎসব)
(৩) কারাম উৎসব
উৎসবে নাচ-গান, সামষ্টিক ভোজ ও ঐতিহ্যবাহী আচার পালিত হয়।
সামাজিক কাঠামো
(১) সমাজ পিতৃতান্ত্রিক।
(২) গ্রামের প্রধানকে “মাঝি” বলা হয়।
(৩) গোষ্ঠীভিত্তিক সামাজিক শৃঙ্খলা বিদ্যমান।
বিবাহ প্রথা
(১) পারিবারিক সম্মতিতে বিবাহ হয়।
(২) কনে পক্ষকে প্রতীকী উপহার বা কন্যামূল্য দেওয়া হয়।
(৩) নাচ-গান ও সামাজিক ভোজ বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
(৪) বিবাহ সাধারণত গোষ্ঠীর ভেতরে হলেও একই কুলে বিবাহ নিষিদ্ধ।
শিক্ষা ও বর্তমান অবস্থা
(১) অতীতে শিক্ষার হার কম ছিল।
(২) বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে শিক্ষার হার বাড়ছে।
(৩) ভূমি অধিকার ও অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ২.৫–৩ লক্ষের মধ্যে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী তাদের সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন (বিশেষত ভারতে)।







Leave a Reply