পাংখুয়া/পাংখো (Pangkho / Pangkhua / Pangkhu) বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি স্বল্পসংখ্যক আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তারা প্রধানত বান্দরবান জেলার দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে, যদিও রাঙামাটির কিছু এলাকাতেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও ঐতিহ্যনির্ভর জীবনযাপনের কারণে পাংখুয়াদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় সুস্পষ্টভাবে বজায় রয়েছে।
আগমন ও উৎপত্তি
গবেষকদের ধারণা অনুযায়ী—
- পাংখুয়া জনগোষ্ঠী তিব্বত-বার্মা ভাষাভিত্তিক কুকি-চিন নৃগোষ্ঠীর অংশ।
- তাদের পূর্বপুরুষরা বহু শতাব্দী আগে বর্তমান মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।
- দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে বসবাসের ফলে তারা দীর্ঘদিন স্বতন্ত্র গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সমাজব্যবস্থা বজায় রেখেছে।
ধর্মবিশ্বাস
পাংখুয়া সমাজে ধর্মীয় রূপান্তর লক্ষ্য করা যায়—
- অতীতে তারা প্রধানত প্রকৃতি-নির্ভর প্রাণবাদী লোকবিশ্বাস অনুসরণ করত।
- পরবর্তীকালে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবে অধিকাংশ পাংখুয়া বর্তমানে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে।
- গির্জাকেন্দ্রিক প্রার্থনা, ধর্মীয় সংগীত ও বড়দিনসহ বিভিন্ন উৎসব তাদের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভাষা
পাংখুয়া ভাষা তিব্বত-বার্মা ভাষাপরিবারভুক্ত এবং কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
- দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহার বজায় থাকলেও শিক্ষা ও প্রশাসনিক যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- ভাষা সংরক্ষণ ও লিখিত রূপ বিকাশে সীমিত হলেও কিছু সাংস্কৃতিক উদ্যোগ দেখা যায়।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- বসতি সাধারণত পাহাড়ের ঢাল বা চূড়ায় নির্মিত বাঁশ ও কাঠের উঁচু ঘর।
- প্রধান জীবিকা: জুম চাষ, বনজ সম্পদ সংগ্রহ, শিকার ও ক্ষুদ্র কৃষিকাজ।
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক রঙিন বোনা কাপড়নির্ভর; নারীদের বয়নশিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- সমবেত গান, নৃত্য, লোককথা ও ধর্মীয় সংগীত পাংখুয়া সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- খ্রিস্টীয় ধর্মীয় উৎসব সামাজিক ঐক্য ও আনন্দের প্রধান উপলক্ষ।
শিক্ষা
ঐতিহাসিকভাবে পাংখুয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল—
- দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এর প্রধান কারণ।
- বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ, বিশেষ করে মিশনারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষার হার ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- নতুন প্রজন্ম বিদ্যালয়মুখী হয়ে সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
বিবাহরীতি
- বিবাহ সাধারণত গোষ্ঠীর ভেতরে পারিবারিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।
- বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গির্জায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
- বিয়েতে ভোজ, গান ও সামষ্টিক আনন্দ-অনুষ্ঠান সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- পাংখুয়া সমাজ গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ও পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর।
- গ্রামভিত্তিক নেতৃত্ব, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- সামষ্টিক শ্রম, উৎসব ও ধর্মীয় আচার তাদের সামাজিক ঐক্যের ভিত্তি।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে পাংখুয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ১০–২০ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়, যা তাদেরকে স্বল্পসংখ্যক কিন্তু স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়সম্পন্ন নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে।
উপসংহার
পাংখুয়া/পাংখো জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুকি-চিন ঐতিহ্য, জুমনির্ভর জীবন, বয়নশিল্প, সমবেত সংগীত এবং খ্রিস্টধর্মভিত্তিক সামাজিক সংগঠন—সব মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। আধুনিক শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন এলেও তারা নিজেদের সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্য সংরক্ষণের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আরও পড়ুনঃ বম জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের পরিচিতি







Leave a Reply