“বুলবুল পাখি ময়না টিয়ে, আয় না যা না গান শুনিয়ে…”
সে অনেক, অনেক বছর আগের কথা। তবে গল্প-বুড়ির সময়কাল নয়—গুনে গুনে ৬১ বছর আগের কথা।
তখন টাকা-আনার যুগ। চার পয়সায় এক আনা, ষোলো আনায় এক টাকা। দশমিক মুদ্রা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে, তবে পুরোপুরি নয়।
তখনকার কয়েন ছিল—এক পয়সা, দুই পয়সা, এক আনা, চার আনা, আট আনা, এক টাকা। এক টাকার কয়েন কমই দেখা যেতো, কারণ এক টাকার নোটও ছিল। তাছাড়া এক টাকার কয়েন যে ধাতু দিয়ে তৈরি হতো, তার ধাতব মূল্যই এক টাকা ছাড়িয়ে যেতো বলে শোনা যেতো!
যাই হোক,
গল্পের আসল জায়গায় আসি।
দুই পয়সা আর দুই আনার কয়েন দেখতে অবিকল একরকম। লেখাও প্রায় একই, “দুই আনা” আর “আধ আনা”—এভাবে। তবে সাইজে একটু ছোট-বড়।
তখন দেশে—অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান অংশে—সাক্ষরতার হার ছি্লো আনুমানিক ১৮–২০ শতাংশ, যা এখন ৭৮ শতাংশ। বেশিরভাগ মানুষ কয়েনের ওপর লেখা ঠিকমতো পড়তে পারতেন না।
বাজারে একদিন একটি “নকল” দুই আনা ধরা পড়লো। আশেপাশে হৈচৈ পড়ে গে্লো। সবাই ভিড় জমালো নকল পয়সা দেখতে। আমিও গেলাম। দেখি, সাইজ একেবারে দুই আনার মতোই। শুধু লেখাটা পড়ে বোঝা যায়—ওপর লেখা “আধ আনা বা দুই পয়সা”!
বালক বয়সে মনে প্রশ্ন জাগলো—এটা বানালো কীভাবে?
একদিন এক সহপাঠী—নাকি সহগামী বন্ধু, ঠিক মনে নেই—তার কাছে কৌতূহল মেটাতে জিজ্ঞেস করলাম। সে গম্ভীর ভঙ্গিতে বললো, “এটা তো খুব সহজ! ট্রেনের চাকার নিচে দিলেই দুই পয়সা দুই আনার সাইজ হয়ে যাবে। একটা দুই পয়সার কয়েন নিয়ে আয়, দুই আনা বানিয়ে দেবো।”
ভাবলাম, এটা তো একেবারে সহজ কাজ! কোনো পিটাপিটির দরকার নেই—ট্রেনই সব কাজ করে দেবে!
এবার আসি আসল ঘটনায়।
তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কিছুটা রেলপথ ধরে যেতে হতো। আসা কিংবা যাওয়ার পথে প্রায়ই ট্রেনের দেখা মিলতো। একটা দুই পয়সার কয়েন জোগাড় করে কিছু না কিনে, না খেয়ে পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই—কবে সেই বন্ধু আমাকে দুই আনা বানিয়ে দেবে! তারপর দু’জনে মজা করে খাজা কিনে খাবো।
একদিন দুই বন্ধু স্কুল থেকে ফিরছি। ভাগ্যক্রমে সেদিন ট্রেনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। দূর থেকে ট্রেন আসতে দেখেই বন্ধুটি আমার কাছ থেকে কয়েনটা নিয়ে রেললাইনের ওপর রাখ্লো। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। ট্রেনটা পার হয়ে গেলেই দুই পয়সা হয়ে যাবে দুই আনা—কি মজা! বেশ উত্তেজনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
ট্রেন চলে গেল।
দুই পয়সা আর দুই আনা হলো না। সাইজ বড় হলো ঠিকই, কিন্তু একদিকে চওড়া হয়ে কোদাল-সদৃশ আকার ধারণ করলো!
বন্ধুটি লজ্জা পে্লো। আমি দুঃখভরা মন নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। কারণ সেটি আর দুই পয়সা হিসেবেও চলবে না। তখনকার দিনে দুই পয়সার খাজা কিনলে খেতে খেতে দুই মাইল পথ অতিক্রম করা যেতো। তখন দূরত্ব মাপার কিলোমিটার পদ্ধতি চালু হয়নি।
এই হলো আমার নিজস্ব জীবনকাহিনী—দুই পয়সা থেকে দুই আনা হওয়ার স্বপ্ন, আর কোদাল-সদৃশ বাস্তবতার এক রম্য স্মৃতি।
আরও পড়ুনঃ পাদের গন্ধে আর নাক সিটকানো নয়—আসছে গোলাপ আর চকলেট ঘ্রাণ!







Leave a Reply