আধুনিক মেডিসিনের জনকদের আত্মত্যাগ
বিজ্ঞান ও চিকিৎসাবিদ্যার ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা শুধু গবেষণাগারে বসে তত্ত্ব দেননি—নিজেদের শরীরকেই বানিয়েছেন পরীক্ষাগার। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির পেছনে তাঁদের এই সাহসী ও আত্মত্যাগী মানসিকতা গভীর ভূমিকা রেখেছে। তারই জীবন্ত উদাহরণ অস্ট্রেলিয়ান গবেষক প্রফেসর ব্যারি জেমস মার্শাল – সংক্ষেপে ব্যারি মার্শাল।
ব্যারি মার্শাল: নিজের শরীরে জীবাণু ঢুকিয়ে প্রমাণ
১৯৮০–এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসক Barry Marshall দাবি করেন যে পেপটিক আলসারের মূল কারণ মানসিক চাপ বা ঝাল খাবার নয়, বরং Helicobacter pylori নামের একটি ব্যাকটেরিয়া। সে সময় চিকিৎসা জগৎ তাঁর তত্ত্ব মানতে চায়নি।
অবশেষে তিনি নিজের শরীরেই সেই জীবাণু গ্রহণ করেন। কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর গ্যাস্ট্রাইটিসের লক্ষণ দেখা দেয়। পরে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়ে তিনি সুস্থ হন। এই আত্মপরীক্ষার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে আলসার সংক্রমণজনিত রোগ। তাঁর এই গবেষণার জন্য তিনি Robin Warren–এর সঙ্গে ২০০৫ সালে Nobel Prize in Physiology or Medicine লাভ করেন।
এটি ছিল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
ভার্নার ফোরসম্যান: নিজের হৃদয়ে ক্যাথেটার
জার্মান চিকিৎসক Werner Forssmann ১৯২৯ সালে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে মানুষের হৃদয়ে নিরাপদে ক্যাথেটার প্রবেশ করানো সম্ভব। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা অনুমতি দেয়নি।
তিনি নিজেই নিজের বাহুর শিরা দিয়ে একটি ক্যাথেটার ঢুকিয়ে তা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে দেন এবং এক্স-রে করে প্রমাণ করেন। এই আত্মঝুঁকিপূর্ণ পরীক্ষা আজকের কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন পদ্ধতির ভিত্তি। পরবর্তীতে তিনি ১৯৫৬ সালে Nobel Prize in Physiology or Medicine লাভ করেন।
জন হান্টার ও সংক্রমণ গবেষণা
১৮শ শতকের সার্জন John Hunter যৌনরোগ সংক্রান্ত গবেষণায় নিজেকে সংক্রমিত করেছিলেন। যদিও তাঁর সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল প্রমাণিত হয়, তবুও তাঁর আত্মপরীক্ষা চিকিৎসা গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়—নিজের শরীরকে গবেষণার ঝুঁকিতে ফেলা কতটা বিপজ্জনক ও সীমাবদ্ধ।
আত্মত্যাগ নাকি বৈজ্ঞানিক সাহস?
এইসব উদাহরণ দেখায়—আধুনিক মেডিসিন কেবল তত্ত্বে গড়ে ওঠেনি; গড়ে উঠেছে মানুষের ব্যক্তিগত সাহস, কৌতূহল ও কখনো কখনো চরম ঝুঁকির মধ্য দিয়ে।
তবে আজকের দিনে এ ধরনের আত্মপরীক্ষা কঠোর নৈতিক নীতিমালার আওতায় পড়ে। আধুনিক গবেষণায় রয়েছে নৈতিক কমিটি, ইনস্টিটিউশনাল রিভিউ বোর্ড (IRB), এবং কঠোর নিরাপত্তা বিধান। কারণ, বিজ্ঞান এখন ব্যক্তিগত সাহসের উপর নয়, প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে এগোয়।
উপসংহার
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এই মানুষগুলো দেখিয়েছেন—জ্ঞান অর্জনের জন্য কখনো কখনো ব্যক্তিগত ঝুঁকি নেওয়া হয়েছে। তবে আজকের শিক্ষা হলো: গবেষণা হবে সাহসী, কিন্তু দায়িত্বশীল; অগ্রগতি হবে মানবকল্যাণের জন্য, কিন্তু নৈতিকতার সীমার ভেতরে।
আরও পড়ুনঃ পোষা কুকুরের ‘চুমু’ই হয়ে গেলো প্রাণঘাতী বিপদের কারণ







Leave a Reply