সম্প্রতি একটি বিদেশি সংবাদ চোখে পড়লো—একজন মানুষ তার আদরের পোষা কুকুরকে দিয়ে শরীর চাটাতো। সেখান থেকে সংক্রমিত হতে হাত ও পা হারিয়েছেন। খবরটি পড়েই মনে হলো, আমরা অনেক সময় আবেগে এমন এক সীমা অতিক্রম করি, যার ফল ভয়াবহ হতে পারে।
পশু তো পশুই—সীমা ভুললে দায় কার?
পশু পশুই। তাকে আহার দাও, যত্ন করো, সে তোমার প্রতি অনুগত থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে সে মানুষ হয়ে যায় না। তার স্বভাব, তার প্রবৃত্তি, তার প্রতিক্রিয়া—সবকিছুই প্রাণীর সীমার মধ্যে। যদিও মানুষের মুখেও বিশ থাকে! মানুষ দ্বারাই আজকাল মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে
খবরটি পড়তে পড়তেই আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল।
“তখন আমার বয়স নয়-দশ বছর। এক মামাবাড়ি (চাচাতো) বেড়াতে গেছি। বাড়িতে নতুন ভাগ্নে পেয়েছে বলে সবাই খুব আদর করছে। আমার এক মামা সারাদিন আমাকে সঙ্গ দিতেন। তাদের বাড়িতে একটি কুকুর ছিল। আমি কাছে যেতেই মামা বললেন, “এটা কাউকে কিছু বলে না।”
শিশু মন। বিশ্বাস করে ফেললাম।
কৌতূহল আর আহ্লাদে কুকুরটির মাথার উপর পা তুলে একটু দুষ্টুমি করে পরীক্ষা করতে লাগলাম। একবার করলাম—কিছু বললো না। দুইবার করলাম—তবুও না। তৃতীয়বার করতেই আচমকা পায়ের নিচ থেকে মাথা টেনে নিয়ে ‘ঘ্যা’ করে আমার পায়ের অর্ধেকটা মুখে পুরে নি্লো। উপরে দুইটা, নিচে দুইটা দাঁত বসিয়ে দিলো। তারপর নির্লিপ্ত নির্বিকার, আগের মতোই চুপচাপ, যেন কিছুই হয় নাই।“
ওর দৃষ্টিটা আজও মনে আছে। যেন বলছে—
“মশকরা একবার ভালো, দুইবার ভালো, তিনবার আর সেটা মশকরা থাকে না।”
প্রায় ৬৫ বছর হয়ে গেলো, আজও পায়ে সেই দাগ রয়ে গেছে—একটি শিক্ষা হয়ে।
তখন জলাতঙ্কের টিকা সহজলভ্য ছিল কিনা জানি না। একজন লোক এসে ঝাঁঝড়ের ভাঙা খাপড়ায় ফিসফাস কি যেন পড়ে ফু দিয়ে পায়ে লাগিয়ে দিলেন। চুম্বকের মতো পায়ে লেগে থাকলো। দুদিন পর সেটা নিজে থেকেই খুলে পড়ে গেলো। চিকিৎসা বলতে ওইটুকুই।
আজও ভাবি—একটা মাটির পাত্রের ভাঙা খাপড়া কীভাবে আঠা ছাড়াই পায়ে লেগে ছিল? হয়তো ভয়, বিশ্বাস আর গ্রাম্য কুসংস্কারের মিশ্রণে আমরা সেটাকেই চিকিৎসা ভেবেছিলাম।
কিন্তু মূল শিক্ষা অন্য জায়গায়।
আমরা অনেক সময় আবেগে প্রাণীকে মানুষ ভাবতে শুরু করি। তাকে পরিবারের সদস্য বলি, সন্তান বলি—এতে আপত্তি নেই। ভালোবাসা অপরাধ নয়। কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করা বিপজ্জনক।
প্রাণীর নিজস্ব সীমানা আছে।
তার ধৈর্যেরও সীমা আছে।
তার প্রতিক্রিয়াও প্রবৃত্তিনির্ভর।
মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব—ভালোবাসবো, যত্ন নেবো, কিন্তু প্রাকৃতিক সত্য অস্বীকার করবো না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সতর্কতা আরও বেশি প্রয়োজন।
সংবাদের ঘটনাটি আমাকে তাই আবার স্মরণ করিয়ে দিল—
প্রকৃতিকে অস্বীকার করলে প্রকৃতি একদিন কঠোরভাবে মনে করিয়ে দেয়।
ভালোবাসা থাকুক, কিন্তু বোধবুদ্ধি সঙ্গে থাকুক।
আরও পড়ুনঃ পোষা কুকুরের ‘চুমু’ই হয়ে গেলো প্রাণঘাতী বিপদের কারণ







Leave a Reply