শান্তির ধর্ম ইসলামকে সহিংস ধর্ম হিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রায়ই কয়েকটি নির্দিষ্ট আয়াত আংশিকভাবে উদ্ধৃত করা হয়—বিশেষ করে সুরা বাকারা (২:১৯১), সুরা তওবা (৯:৫) এবং সুরা আল-আহযাব (৩৩:৬১)। কিছু আলেম নামধারী প্রচারক আলোচক বা সমালোচক এগুলোকে “অমুসলিম হত্যার স্থায়ী নির্দেশ” হিসেবে উপস্থাপন করেন। কিন্তু কোরআনের ভাষা, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতসমূহ একত্রে বিবেচনা করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
এই নিবন্ধে তিনটি আয়াতই প্রেক্ষাপটসহ আলোচনা করবো।
সুরা বাকারা (২:১৯১): নির্যাতনের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার অনুমতি
আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
মক্কার মুসলমানরা দীর্ঘদিন ধরে কুরাইশদের নির্যাতন, সামাজিক বয়কট, শারীরিক নির্যাতন ও ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদের শিকার হচ্ছিল। তারা আত্মরক্ষামূলক প্রতিরোধের অনুমতিও পেত না। হিজরতের পর মদিনায় এসে যখন কুরাইশরা আক্রমণাত্মক অবস্থান বজায় রাখে, তখন নির্যাতনের জবাবে সীমিত আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়। এই আয়াত সেই প্রেক্ষাপটেই নাজিল হয়—আগ্রাসন নয়, বরং উচ্ছেদ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা হিসেবে।
আয়াতটি বলছে:
“আর তাদেরকে হত্যা কর যেখানে তাদেরকে পাও এবং তাদেরকে বের করে দাও যেখান থেকে তারা তোমাদেরকে বের করেছিল…”
এটি কোনো সাধারণ বা স্থায়ী যুদ্ধের নির্দেশ নয়। বরং—
- মক্কার মুসলমানরা দীর্ঘদিন নির্যাতন, হত্যাচেষ্টা ও উচ্ছেদের শিকার হয়েছিল।
- প্রথমে তাদের ধৈর্য ধরতে বলা হয়।
- পরে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধের সীমিত অনুমতি দেওয়া হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা আগের আয়াতে:
“তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর তাদের বিরুদ্ধে যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।” (২:১৯০)
অতএব—
- যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ নয়
- কেবল আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা
- নিরপরাধের ক্ষতি নিষিদ্ধ
এটি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের self-defense নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, হত্যার কথা বলা হলেও মক্কা বিজয়ের পর নবীজির ঘোর বিরোধী অনেক বড় শত্রুকেও ক্ষমা করে দেন- যারা পরবর্তীতে নবীজির বিশ্বস্ত সহচর হয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আবু জাহেল পুত্র ইকরিমাকে তিনি প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করেছিলেন।
সুরা তওবা (৯:৫): চুক্তিভঙ্গকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
মদিনা পর্বে কিছু আরব মুশরিক গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে তারা চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং শত্রুপক্ষকে সহায়তা করে। এই বিশ্বাসঘাতকতা ও যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষিতে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে যারা চুক্তি ভঙ্গ করেনি বা শান্তি চেয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে যুদ্ধের নির্দেশ প্রযোজ্য ছিল না—বরং নিরাপত্তা দেওয়ার কথাও উল্লেখ আছে।
এই আয়াতকে প্রায়ই “তলোয়ারের আয়াত” বলে ভুলভাবে সাধারণীকরণ করা হয়। কিন্তু সূরার শুরুতেই ব্যতিক্রম স্পষ্ট করা হয়েছে—
“যেসব মুশরিক তোমাদের সঙ্গে চুক্তি ভঙ্গ করেনি… তাদের সঙ্গে চুক্তি পূর্ণ কর।” (৯:৪)
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
- কিছু গোত্র মুসলমানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে পরে তা ভঙ্গ করে।
- তারা আক্রমণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল।
- সেই যুদ্ধাবস্থায় এই নির্দেশ দেওয়া হয়।
এখানেও গুরুত্বপূর্ণ মানবিক শর্ত রয়েছে—
“যদি কোনো মুশরিক আশ্রয় চায়, তাকে আশ্রয় দাও… নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও।” (৯:৬)
অর্থাৎ—
- সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নয়
- আত্মসমর্পণ বা শান্তির সুযোগ উন্মুক্ত
- যুদ্ধের মধ্যেও মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত
সুরা আল-আহযাব (৩৩:৬১): রাষ্ট্রদ্রোহী ষড়যন্ত্রকারীদের শাস্তির প্রসঙ্গ
আয়াত নাজিলের প্রেক্ষাপট
মদিনায় অবস্থানরত কিছু মুনাফিক, গুজব রটনাকারী ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী যুদ্ধসংকটের সময়ে শহরের ভেতরে অস্থিরতা সৃষ্টি করছিল এবং মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা বিপন্ন করছিল। তাদের এই নাশকতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ না হলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতা হিসেবে আয়াতটি নাজিল হয়। এটি সাধারণ অমুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়; বরং যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রদ্রোহ ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত গোষ্ঠীর প্রসঙ্গে বলা।
উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে যে এক শ্রেণির লোককে “যেখানেই পাওয়া যাবে পাকড়াও ও কঠোর শাস্তি” দেওয়া হবে। কিন্তু এর আগের আয়াতগুলো (৩৩:৬০) না পড়লে ভুল বোঝাবুঝি হয়।
এর আগের আয়াতেই আল্লাহ নবীজিকে বলেছেনঃ
“যদি মুনাফিকগণ এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা ও শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেবো। অতঃপর তারা সেখানে তোমার প্রতিবেশী হয়ে অল্প সময়ই থাকবে।“-(৩৩:৬০)
প্রেক্ষাপট ছিল—
- মদিনায় কিছু মুনাফিক, গুজবসৃষ্টিকারী ও রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী সক্রিয় ছিল।
- তারা যুদ্ধাবস্থায় শহরের নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা করছিল।
- সমাজে ভয় ও বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছিল।
অতএব এই নির্দেশ—সাধারণ মানুষ বা সব অমুসলিমের বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রদ্রোহ, নাশকতা ও যুদ্ধকালীন ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক আইন।
আধুনিক রাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতা বা যুদ্ধকালীন নাশকতা আইনের অনুরূপ।
এটি একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা পরিস্থিতির বিধান, সর্বজনীন হত্যার নির্দেশ নয়।
কোরআনের সামগ্রিক নীতি: শান্তি, ন্যায় ও মানবজীবনের মর্যাদা
কোরআনের পূর্ণ বার্তা দেখলে দেখা যায়—
ধর্মে জবরদস্তি নেই: (২:২৫৬)
শান্তির প্রস্তাব এলে যুদ্ধ বন্ধ: (৮:৬১)
নিরপরাধ হত্যা সমগ্র মানবজাতি হত্যার সমান: (৫:৩২)
অতএব যুদ্ধসংক্রান্ত আয়াতগুলো—
- প্রেক্ষাপটনির্ভর
- আত্মরক্ষামূলক
- ন্যায়ভিত্তিক
- সীমাবদ্ধ
ভুল ব্যাখ্যার কারণ
ভ্রান্ত ধারণা সাধারণত তৈরি হয়—
- আংশিক উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে
- ইতিহাস ও ভাষাগত প্রেক্ষাপট বাদ দিলে
- রাজনৈতিক বা চরমপন্থী উদ্দেশ্যে ধর্ম ব্যবহার করলে
ফলে কোরআনের ন্যায়ভিত্তিক শিক্ষা বিকৃত হয়ে যায়।
উপসংহার
সুরা বাকারা ২:১৯১, সুরা তওবা ৯:৫ এবং সুরা আল-আহযাব ৩৩:৬১—এই তিনটি আয়াতই নির্দিষ্ট সংঘাত, চুক্তিভঙ্গ, রাষ্ট্রদ্রোহ ও আত্মরক্ষার পরিস্থিতি নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এগুলো কোনোভাবেই সব অমুসলিমকে হত্যা করার সার্বজনীন নির্দেশ নয়।
বরং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা—
- ন্যায়বিচার
- সংযম
- চুক্তিপালন
- শান্তি
- মানবজীবনের মর্যাদা রক্ষা
সুতরাং “কাফেরদের হত্যা করার নির্দেশ”—এই দাবি কোরআনের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রেক্ষাপটবিহীন ব্যাখ্যার ফল।
আরও পড়ুনঃ দাঁড়িপাল্লা কি আল্লাহর মার্কা







Leave a Reply