জৈন ধর্ম ভারতের অন্যতম প্রাচীন ধর্মীয় ধারা। এই ধর্মের মূল দর্শন গড়ে উঠেছে অহিংসা, আত্মসংযম ও ত্যাগের ওপর। ঐতিহাসিকভাবে জৈন ধর্ম বৌদ্ধ ও বৈদিক ধর্মচিন্তার সমসাময়িক, এবং ভারতের সামাজিক ও নৈতিক চর্চায় এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
ঐতিহাসিক পটভূমি
জৈন ধর্মের উৎপত্তি খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে। জৈন ঐতিহ্য অনুযায়ী এই ধর্মে মোট ২৪ জন তীর্থংকর রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সর্বশেষ ও ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য তীর্থংকর হলেন মহাবীর (খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৯–৫২৭)। তিনি গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন এবং উত্তর ভারতের বিহার ও পূর্ব উত্তর প্রদেশ অঞ্চলে তাঁর ধর্মপ্রচার চালান।
তবে জৈন ধর্ম নিজেকে মহাবীর-প্রবর্তিত নয়, বরং আরও প্রাচীন এক ধারার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখে। মহাবীরকে জৈন ধর্মের সংস্কারক বা পুনর্জাগরণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মূল বিশ্বাস ও দর্শন
জৈন ধর্মের কেন্দ্রীয় নীতি হলো অহিংসা (Ahimsa)—যা শুধু মানুষ নয়, সব জীবের প্রতিই প্রযোজ্য। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে—
- সত্য (Satya)
- অচৌর্য বা চুরি না করা (Asteya)
- ব্রহ্মচর্য
- অপরিগ্রহ বা সম্পত্তির প্রতি আসক্তি পরিহার
এই নীতিগুলো পালন করেই আত্মা কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষ লাভ করতে পারে—এটাই জৈন দর্শনের মূল কথা।
শাখা ও মতভেদ
জৈন ধর্ম প্রধানত দুইটি বড় শাখায় বিভক্ত—
- দিগম্বর: যারা বিশ্বাস করেন সন্ন্যাসীর জন্য সম্পূর্ণ নিরাবরণ জীবন আদর্শ।
- শ্বেতাম্বর: যারা সাদা বস্ত্র পরিধানকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
এই বিভাজন মূলত আচরণ ও ধর্মাচরণে হলেও দর্শনের মূল কাঠামো প্রায় অভিন্ন।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
সংখ্যায় কম হলেও জৈন সম্প্রদায় ভারতের ব্যবসা, শিল্প, শিক্ষা ও দাতব্য খাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। ঐতিহাসিকভাবে জৈনরা ব্যবসা ও বাণিজ্যে সক্রিয় ছিলেন, যার ফলে তারা আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হলেও জীবনযাপনে সংযম বজায় রাখার চর্চা গড়ে ওঠে।
ভারতের বহু প্রাচীন মন্দির, গুহা ও ভাস্কর্য—বিশেষ করে রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ ও কর্ণাটকে—জৈন শিল্প ও স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে।
সমকালীন প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
আজকের ভারতে জৈন ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ৫০-৬০ লাখ। এটি একটি সংখ্যালঘু ধর্ম হলেও নৈতিক ও পরিবেশবান্ধব জীবনধারার প্রশ্নে এর দর্শন নতুন করে আলোচনায় আসছে। প্রাণীহত্যা, ভোগবাদ ও পরিবেশ সংকটের যুগে জৈন অহিংসা ও অপরিগ্রহ দর্শন একটি বিকল্প নৈতিক কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে বাস্তবতায় প্রশ্ন রয়ে যায়—আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক সমাজে জৈন ধর্মের কঠোর সংযমবাদ কতটা অনুসরণযোগ্য, আর কতটা প্রতীকী হয়ে উঠছে। এই দ্বন্দ্বই আজকের জৈন সমাজের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
আরও পড়ুনঃ
১। শিখ ধর্ম: মধ্যযুগীয় ভারতের ধর্মীয় সংঘাতের ভেতর প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরে বিশ্বাসী এক সমন্বয়বাদী ধর্ম
২। দীন-ই-ইলাহী: সম্রাট আকবরের ধর্মীয় পরীক্ষা, রাষ্ট্রচিন্তা ও আজকের রাজনীতির চিত্র
৩। হিন্দুধর্ম: প্রাচীন সভ্যতা থেকে বৈশ্বিক উপস্থিতি ও সমকালীন রাজনীতির কেন্দ্রে







Leave a Reply