পাকিস্তানের ইতিহাসে ইস্কান্দার মির্জা এমন এক চরিত্র, যাকে একদিকে পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট বলা হয়, অন্যদিকে তাকে পাকিস্তানের গণতন্ত্র ধ্বংসের প্রথম স্থপতি হিসেবেও দেখা হয়। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের শেষ গভর্নর জেনারেল, প্রথম প্রেসিডেন্ট, সামরিক শাসনের সূচনাকারী এবং একই সঙ্গে নিজেরই ডাকা সেনাবাহিনীর হাতে অপমানজনকভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া এক শাসক।
তার জীবন যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত—বংশগত ক্ষমতা, প্রশাসনিক উত্থান, রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, ষড়যন্ত্র, সামরিক শাসন, অপমান, নির্বাসন, দারিদ্র্য এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক মৃত্যু, যার পর নিজের দেশও তার মৃতদেহ নিতে রাজি হয়নি।
মীর জাফরের বংশধর
ইস্কান্দার মির্জার পুরো নাম ছিল সাইয়্যিদ ইস্কান্দার আলী মির্জা। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল নবাবি ও জমিদার পরিবার। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো—তিনি ছিলেন বাংলার কুখ্যাত নবাব মীর জাফরের বংশধর। সাধারণভাবে তাকে মীর জাফরের প্রপৌত্র বা উত্তরসূরি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বাংলার ইতিহাসে মীর জাফরের নাম যেমন বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক, পাকিস্তানের ইতিহাসে অনেকেই ইস্কান্দার মির্জাকেও প্রায় একইভাবে স্মরণ করেন। কারণ, তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ—তিনি নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানকে সামরিক শাসনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
ব্রিটিশ আমলে কর্মজীবনের শুরু
ইস্কান্দার মির্জা ব্রিটিশ ভারতের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি ব্রিটেনের বিখ্যাত স্যান্ডহার্স্ট সামরিক একাডেমিতে ভর্তি হন। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে স্যান্ডহার্স্টে ভর্তি হওয়া প্রথমদিকের মুসলিম অফিসারদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।
সেখান থেকে পাশ করার পর তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে থাকার পর তিনি প্রশাসনিক জীবনে প্রবেশ করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের ‘ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল সার্ভিস’-এ কাজ শুরু করেন। এখানেই তার প্রকৃত উত্থান শুরু হয়।
ব্রিটিশ শাসকেরা তাকে সীমান্ত অঞ্চল, উপজাতীয় এলাকা এবং নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশাসনে ব্যবহার করত। তিনি দ্রুত বুঝে যান, রাজনীতি নয়—ক্ষমতার প্রকৃত উৎস হচ্ছে আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসন। পরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি ঠিক এই তিনটিকেই ব্যবহার করেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর দ্রুত উত্থান
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ইস্কান্দার মির্জা নতুন রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। তিনি পাকিস্তানের প্রথম প্রতিরক্ষা সচিব হন। ভারত ভাগের পরে সেনাবাহিনী ও সামরিক সম্পদ ভাগাভাগির মতো জটিল কাজে তার ভূমিকা ছিল।
প্রতিরক্ষা সচিব হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানের সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। বিশেষ করে জেনারেল আইয়ুব খানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। পরবর্তীকালে এই সম্পর্কই তার রাজনৈতিক উত্থান এবং পতন—দুটোরই কারণ হয়।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর: কঠোর শাসনের সূচনা
১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে মুসলিম লীগ ভরাডুবি করে। কেন্দ্রীয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা মনে করেছিল, পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক উত্থান পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব বাংলার নির্বাচিত সরকার ভেঙে দেয় এবং ইস্কান্দার মির্জাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর করে পাঠায়।
তিনি ঢাকায় এসে প্রথমেই কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ সীমিত করা হয়, বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন সংসদ সদস্য, শিক্ষক, ছাত্রনেতা এবং রাজনৈতিক কর্মী।
ইস্কান্দার মির্জার শাসনব্যবস্থা ছিল পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশনির্ভর। তিনি বিশ্বাস করতেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিলে তারা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। ফলে তিনি নির্বাচিত রাজনীতিকে দুর্বল এবং প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে থাকেন।
তবে তিনি শুধু দমননীতি চালাননি। প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয়ও দিয়েছিলেন। বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। বিভিন্ন সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও বাজারে ছদ্মবেশে গিয়ে পরিস্থিতি দেখতেন। কিন্তু তার এই প্রশাসনিক দক্ষতা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি, কারণ মানুষ তাকে নির্বাচিত সরকারের প্রতিনিধি নয়, কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া শাসক হিসেবেই দেখত।
কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে প্রবেশ
পূর্ব পাকিস্তানে কঠোর শাসন প্রতিষ্ঠার পর তাকে করাচিতে ডেকে নেওয়া হয়। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হন। এই সময় পাকিস্তানের রাজনীতিতে একের পর এক সংকট চলছিল। প্রধানমন্ত্রী বদল হচ্ছিল বারবার, সংবিধান হচ্ছিল না, আর ক্ষমতা ক্রমে রাজনীতিবিদদের হাত থেকে আমলা ও সেনাবাহিনীর হাতে চলে যাচ্ছিল।
এই সময় ইস্কান্দার মির্জা বুঝতে পারেন, সরাসরি রাজনীতিতে না থেকেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া সম্ভব। তিনি একদিকে রাজনীতিবিদদের দুর্বলতা কাজে লাগান, অন্যদিকে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক গোষ্ঠীকে নিজের পাশে রাখেন।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল: ক্ষমতা দখলের সূচনা
১৯৫৫ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ অসুস্থ হয়ে পড়লে ইস্কান্দার মির্জাকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। এটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় উত্থান।
গভর্নর জেনারেল হিসেবে তিনি দ্রুত নিজের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে থাকেন। পাকিস্তানে তখনও পূর্ণাঙ্গ সংবিধান হয়নি। ফলে গভর্নর জেনারেলের হাতে বিপুল ক্ষমতা ছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও অপসারণ করতে পারতেন, আইনসভা ভেঙে দিতে পারতেন, এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর ভাগ্যও নির্ধারণ করতে পারতেন।
ইস্কান্দার মির্জা ঠিক সেটাই করলেন। তিনি রাজনীতিবিদদের একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে থাকেন। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী বদলাতে থাকেন। কেউ তার অনুগত না হলে তাকে সরিয়ে দেওয়া হতো।
মাত্র দুই বছরের মধ্যে পাকিস্তানে চারজন প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তন হয়। এতে রাজনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, নির্বাচিত সরকার নয়—ক্ষমতার আসল কেন্দ্র হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ভবন ও সেনাবাহিনী।
প্রথম প্রেসিডেন্ট হওয়া
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান কার্যকর হয়। পাকিস্তান তখন আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। গভর্নর জেনারেলের পদ বিলুপ্ত হয় এবং তার জায়গায় ‘প্রেসিডেন্ট’ পদ সৃষ্টি হয়।
১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট হন।
কিন্তু তিনি গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, পাকিস্তানের জনগণ এখনো গণতন্ত্র চালানোর মতো ‘প্রস্তুত’ নয়। তার ধারণা ছিল, রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত, অযোগ্য এবং স্বার্থপর। তাই দেশের জন্য শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক ও সামরিক শাসন প্রয়োজন।
এই চিন্তাভাবনাই তাকে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের গণতন্ত্র ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
সংবিধান বাতিল ও সামরিক শাসন
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়ে। নির্বাচনের কথা উঠছিল, কিন্তু ইস্কান্দার মির্জা ভয় পাচ্ছিলেন—নির্বাচন হলে তার ক্ষমতা কমে যেতে পারে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে জনপ্রিয় দলগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে তিনি পাকিস্তানের সংবিধান বাতিল করেন। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেন। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক বা Chief Martial Law Administrator করেন। ইস্কান্দার মির্জা মনে করেছিলেন, আইয়ুব খান তার প্রতি অনুগত থাকবেন এবং সামরিক শাসনের আড়ালে প্রকৃত ক্ষমতা তার হাতেই থাকবে।
কিন্তু এখানেই তিনি সবচেয়ে বড় ভুল করেন।
২০ দিনের প্রেসিডেন্ট
সংবিধান বাতিলের পরও ইস্কান্দার মির্জা কাগজে-কলমে প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ক্ষমতা ধীরে ধীরে আইয়ুব খানের হাতে চলে যাচ্ছিল।
মাত্র ২০ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর রাতে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট ভবন ঘিরে ফেলে। জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। তাকে বলা হয়, তিনি যদি স্বাক্ষর না করেন, তবে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।
যে ব্যক্তি মাত্র তিন সপ্তাহ আগে গণতন্ত্র ভেঙে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তাকেই সেই সেনাবাহিনী ক্ষমতা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
ইস্কান্দার মির্জাকে তার স্ত্রীসহ পাকিস্তান ছাড়তে বাধ্য করা হয়। রাতারাতি তাকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
এই কারণে তাকে প্রায়ই ‘পাকিস্তানের ২০ দিনের প্রেসিডেন্ট’ বলা হয়। যদিও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই বছরের বেশি সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন, কিন্তু সামরিক আইন জারির পর তার হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ছিল মাত্র ২০ দিন।
অপমানজনক নির্বাসন
লন্ডনে পৌঁছে ইস্কান্দার মির্জার জীবন একেবারে বদলে যায়। পাকিস্তানের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটি হঠাৎ করেই হয়ে গেলেন এক নির্বাসিত, অসহায়, প্রায় নিঃস্ব মানুষ। লন্ডনে তাকে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হয়নি।
শুরুতে তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো আবার কোনোদিন পাকিস্তানে ফিরে যেতে পারবেন। কিন্তু আইয়ুব খান তাকে দেশে ফিরতে দেননি। পাকিস্তানে তার সব রাজনৈতিক প্রভাব শেষ হয়ে যায়।
যে ব্যক্তি একসময় প্রেসিডেন্ট ভবনে থাকতেন, রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণ করতেন, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করতেন—তিনি লন্ডনে একটি ছোট হোটেল বা রেস্টুরেন্টে কাজ করতে বাধ্য হন। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়, তিনি একটি পাকিস্তানি খাবারের হোটেল পরিচালনা করতেন এবং সেখান থেকেই জীবিকা নির্বাহ করতেন।
তার আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, জীবনের শেষ দিকে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তার একসময়কার ঘনিষ্ঠ লোকজনও তাকে ভুলে যায়। পাকিস্তান সরকারও তার প্রতি কোনো সহানুভূতি দেখায়নি।
এ যেন ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর পরিহাস—যে ব্যক্তি অন্যদের ক্ষমতা থেকে সরিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেই ক্ষমতা, দেশ এবং সম্মান—সবকিছু হারাতে হয়।
মৃত্যু ও মৃতদেহ প্রত্যাখ্যান
১৯৬৯ সালের ১৩ নভেম্বর, নিজের ৭০তম জন্মদিনে, লন্ডনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইস্কান্দার মির্জা মারা যান।
কিন্তু মৃত্যুর পরও তার অপমান শেষ হয়নি। পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তার মৃতদেহ পাকিস্তানে নিতে রাজি হননি। তাকে পাকিস্তানে দাফন করার অনুমতিও দেওয়া হয়নি। বলা হয়, তার মৃতেদেহ দেশে এলে জনরোষ সামাল দিতে পারবে না পাকিস্তান সরকার।
একসময় যে মানুষটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন, মৃত্যুর পর সেই পাকিস্তানই তাকে প্রত্যাখ্যান করল।
ইরানে দাফন
ইস্কান্দার মির্জার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন ইরানি বংশোদ্ভূত। সেই সূত্রে ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী তার প্রতি সহানুভূতি দেখান। শাহ নিজের বিশেষ বিমান পাঠিয়ে ইস্কান্দার মির্জার মৃতদেহ লন্ডন থেকে তেহরানে নিয়ে যান।
ইরানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। তেহরানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ইরানের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীরা, কূটনীতিক এবং প্রবাসী পাকিস্তানিরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থাৎ, যাকে পাকিস্তান গ্রহণ করেনি, তাকে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় দেয় অন্য একটি দেশ।
এ ঘটনাটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি বড় প্রতীক হয়ে আছে। সেখানে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মানুষকে মহিমান্বিত করা হয়, আর ক্ষমতা হারালে তাকে সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাওয়া হয়।
ইস্কান্দার মির্জার উত্তরাধিকার
ইস্কান্দার মির্জার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার খুবই বিতর্কিত। তিনি ছিলেন দক্ষ আমলা, কৌশলী প্রশাসক এবং শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পরিবর্তে আমলাতন্ত্র ও সেনাবাহিনীর শাসন প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেন।
তিনি যদি ১৯৫৮ সালে সংবিধান বাতিল না করতেন, তাহলে হয়তো পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। হয়তো সামরিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস শুরু হতো না। হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আরও বেশি রাজনৈতিক অধিকার পেত।
বরং ইস্কান্দার মির্জার সিদ্ধান্ত পাকিস্তানে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করে, যেখানে নির্বাচিত সরকারকে দুর্বল এবং সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী ভাবা হয়। পরে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউল হক এবং পারভেজ মোশাররফ—সবাই কোনো না কোনোভাবে সেই পথেই হেঁটেছেন।
বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে ইস্কান্দার মির্জার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে তিনি যেভাবে নির্বাচিত সরকার ভেঙেছিলেন এবং পূর্ব বাংলার রাজনীতিকে দমন করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে পূর্ব-পশ্চিম বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়। পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে, পাকিস্তানে তাদের ভোট ও মতামতের কোনো মূল্য নেই।
এই মানসিকতা ধীরে ধীরে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার আন্দোলনের পেছনে জমে থাকা ক্ষোভের অংশ হয়ে ওঠে। তাই ইস্কান্দার মির্জা শুধু পাকিস্তানের একজন প্রেসিডেন্ট নন; তিনি পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, পূর্ব বাংলার প্রতি অবিচার এবং সামরিক আধিপত্যেরও একটি প্রতীক।
আরও পড়ুনঃ বঙ্গভঙ্গ: একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নাকি ইতিহাস বদলে দেয়া রাজনৈতিক পদক্ষেপ?







Leave a Reply