বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। তবু দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব শুধু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং ইতিহাসের ব্যাখ্যা, রাষ্ট্রচিন্তা, ক্ষমতার ধারাবাহিকতা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
স্বাধীনতার নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রগঠনের সূচনা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। জাতির নেতৃত্বে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে অল্প সময়ের মধ্যেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি ছিল না; এটি রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তনের সূচনা করে।
এই ঘটনার পর ধারাবাহিক সামরিক ও আধা-সামরিক শাসনের মাধ্যমে রাজনীতির চরিত্র বদলে যায়। জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে নতুন রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। পরে ক্ষমতায় আসেন হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। প্রায় দেড় দশক রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সামরিক প্রভাবাধীন ব্যবস্থায়, যা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করে।
ইতিহাসের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক সংঘাত
স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে মতপার্থক্য মূলত এখানেই গড়ে ওঠে। এক পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও আদর্শকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রচিন্তা নির্মাণ করতে চায়; অন্য পক্ষ জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক বয়ানকে সামনে আনে।
বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের প্রশ্ন, ঘোষণার প্রশ্ন, এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান। যদিও জিয়াউর রহমান নিজে স্বাধীনতার একমাত্র নায়ক দাবি করেননি—তবু রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এই বিষয়টি বারবার আলোচনায় এসেছে।
এছাড়া বিএনপির সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর রাজনৈতিক সমঝোতা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে, কারণ দলটির একটি অংশ ঐতিহাসিকভাবে স্বাধীনতার বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে সমালোচকরা মনে করেন। ফলে দুই প্রধান দলের বিরোধ শুধু ক্ষমতার নয়—আদর্শিক অবস্থানেরও প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
পুনরাবৃত্ত সংকট ও রাষ্ট্রের ঝুঁকি
রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগে বিভিন্ন উগ্র ও ধর্মাশ্রয়ী শক্তি সময়ে সময়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে—এমন আশঙ্কা সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি দুর্বল হলে স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। অনেকের মতে, এ ধরনের প্রবণতা দেশকে অতীতের পাকিস্তান-ধর্মী রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও দেখিয়েছে—প্রধান ধারার রাজনীতি দুর্বল হলে চরমপন্থী শক্তি সুযোগ নিতে পারে। আবার জনগণের ভোট ও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে সেই প্রবণতা প্রতিরোধও সম্ভব।
দ্বন্দ্বের মূল কারণ
এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পেছনে কয়েকটি মৌলিক কারণ কাজ করে—
- ইতিহাসের প্রতিদ্বন্দ্বী বয়ান – মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকার নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা।
- ক্ষমতার ধারাবাহিকতার বিচ্ছিন্নতা – সামরিক শাসন গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত করেছে।
- আদর্শ বনাম বাস্তব রাজনীতি – জোট, সমঝোতা ও ক্ষমতার রাজনীতি আদর্শিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
- জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্ন – ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রচিন্তার ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি।
ভবিষ্যৎ পথ: প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে পরিপক্বতা
৫৫ বছর পর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—ইতিহাসের মৌলিক সত্য নিয়ে ন্যূনতম জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করা। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তি নিয়ে অনন্ত বিরোধ জাতির জন্য ক্ষতিকর।
বিশেষ করে বিএনপিসহ সব দলের উচিত—ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি, সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করা। একইভাবে আওয়ামী লীগেরও প্রয়োজন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা।
সুপারিশ
বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-এর অনুপস্থিতির কারণে স্বাধীনতার প্রশ্ন এবং উগ্রবাদ প্রতিরোধের বিবেচনায় তাদের সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এবার “মন্দের ভালো” হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-কে বেছে নিয়েছে। এই প্রবণতা থেকে ধারণা করা যায়, সাধারণ জনগণ দেশের স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক মঙ্গলের প্রশ্নে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক শক্তিকে সহজে সমর্থন করে না—উগ্রবাদী প্রবণতাকে তো নয়ই।
অতএব, সবচেয়ে বড় দুই রাজনৈতিক দল—আওয়ামী লীগ ও বিএনপির—উচিত পারস্পরিক আলোচনা ও রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব নিরসনের পথে এগিয়ে যাওয়া। স্বাধীনতার প্রশ্নে কোনো দল যেন মিথ্যার আশ্রয় না নেয় এবং দেশের প্রকৃত ইতিহাসকে সম্মানের সঙ্গে মেনে নেয়—এটাই হওয়া উচিত জাতীয় রাজনীতির ন্যূনতম নৈতিক ভিত্তি। একইভাবে স্বাধীনতা বিরোধী ব্যক্তি বা শক্তিকে কোনো দল বা জোটে প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেওয়া জরুরি।
রাজনীতির মূল প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত সুশাসন, উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক কাজের ভিত্তিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করা—ইতিহাসের বিকৃতি বা বিভাজন নয়। জনগণ শেষ পর্যন্ত সেই দলকেই বেছে নেবে, যারা বাস্তব কাজের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করতে পারবে। তাই স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিতর্ককে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে দূরে সরিয়ে রাখা প্রয়োজন।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে উগ্রবাদী ও জঙ্গি প্রবণতার হাত থেকে রক্ষা করতে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছানো সময়ের দাবি। পাশাপাশি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে বৈদেশিক নীতির মৌলিক বিষয়গুলোতেও একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা জরুরি।
এই ধরনের দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠলেই স্বাধীনতার চেতনা শুধু অতীতের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের শক্ত ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো একক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির অর্জন। অতীতের দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করে যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো জনগণের কল্যাণ, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় নামে—তবেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ বাস্তবায়িত হবে। অন্যথায় ইতিহাসের বিতর্কই ভবিষ্যতের অগ্রযাত্রাকে বারবার থামিয়ে দেবে।
আরও পড়ুনঃ
১। নির্বাচন নিষেধাজ্ঞা ও হাসিনার নির্বাসন: আওয়ামী লীগ কি টিকে থাকতে পারবে?
২। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘Prodigal Son’: তারেক রহমানকে যেভাবে দেখছে টাইম ম্যাগাজিন






Leave a Reply