ফতেপুর সিক্রি, ১৫৮২ সাল।
মুঘল দরবারে বসে সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর একটি অস্বাভাবিক ঘোষণা দেন। এটি কোনো সামরিক ফরমান নয়, করনীতি নয়—বরং একটি নতুন নৈতিক জীবনবিধির সূচনা। নাম দেওয়া হয় দীন-ই-ইলাহী।
ইতিহাসের পাতায় এই নামটি আজও বিতর্কিত। কেউ বলেন, আকবর নতুন ধর্ম বানাতে চেয়েছিলেন। কেউ বলেন, এটি ছিলো সব ধর্মের মানুষকে এক ছাতার নিচে আনার একটি রাজনৈতিক কৌশল। আবার কারও মতে, এটি মধ্যযুগে ধর্মীয় সহনশীলতার সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা।
যা ঘটেছিল
দীন-ই-ইলাহী ঘোষণার আগে আকবর বহু বছর ধরে ধর্মীয় বিতর্ক পর্যবেক্ষণ করছিলেন। ফতেপুর সিক্রির ইবাদতখানায় মুসলিম আলেম, হিন্দু পণ্ডিত, জৈন সন্ন্যাসী, খ্রিস্টান যাজক, পারসি মোবাদ—সবাইকে বসিয়ে মুক্ত বিতর্কের আয়োজন করা হয়। কিন্তু এই বিতর্কে আকবর যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে দেখেন, তা হলো—
- প্রত্যেক ধর্ম নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবি করছে
- ধর্মীয় কর্তৃত্ব মানেই রাজনৈতিক প্রভাব
- সাধারণ মানুষ ধর্মের নামে বিভক্ত হচ্ছে
এই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় দীন-ই-ইলাহী।
ধর্ম নয়, রাষ্ট্রীয় নৈতিক দর্শন
ইতিহাসের কঠোর বিশ্লেষণে দেখা যায়—দীন-ই-ইলাহী কোনো ধর্ম ছিলো না। এর ছিলো না—
- ধর্মগ্রন্থ
- উপাসনালয়
- ধর্মীয় আইন
- ধর্মপ্রচার ব্যবস্থা
এটি ছিলো মূলত একটি এলিট নৈতিক নীতিমালা, যার অনুসারী ছিলেন রাজদরবারের কিছু নির্বাচিত ব্যক্তি—যেমন বীরবল, আবুল ফজল। এতে যে সব বিষয় গুরুত্ব পায় তা হলো—
- ন্যায়বিচার
- মানবপ্রেম
- ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
- ব্যক্তিগত সংযম
- সম্রাটের প্রতি আনুগত্য
অর্থাৎ, এটি ঈশ্বরকেন্দ্রিক ধর্মের চেয়ে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক নৈতিকতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়।
রাজনীতিটা এখানেই
এখানেই দীন-ই-ইলাহী সবচেয়ে স্পর্শকাতর। আকবর কার্যত তিনটি কাজ করতে চেয়েছিলেন—
(১) উলামাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমানো
(২) ধর্মের ব্যাখ্যায় সম্রাটের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, অর্থাৎ ধর্মীয় বিষয়ে সম্রাটকে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে বসানো
(৩) বহুধর্মীয় সাম্রাজ্যে একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা তৈরি করা
১৫৭৯ সালের মাহজারনামা আগেই আকবরকে ধর্মীয় ব্যাখ্যায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা ঘোষণা করেছিলো। দীন-ই-ইলাহী সেই পথেরই পরবর্তী ধাপ।
এ কারণে অনেক ইতিহাসবিদ একে বলেন— “Sacred Kingship in Islamic India”
দীন-ই-ইলাহী ব্যর্থ হওয়ার কারণ
দীন-ই-ইলাহী জনগণের মধ্যে সেভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। কারণ—
- এটি সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চাহিদা পূরণ করতো না
- আলেম সমাজ একে বিদ‘আত ও ধর্মবিরোধী বলেছিলো
- এটি সম্রাটনির্ভর ছিলো, প্রতিষ্ঠাননির্ভর নয়
আকবরের মৃত্যুর পর জাহাঙ্গীর এটি প্রায় পরিত্যাগ করেন। ফলে এটি ইতিহাসে একটি ব্যর্থ কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে রয়ে যায়।
আজকের রাজনীতির সাথে তুলনা
এখানেই দীন-ই-ইলাহী আধুনিক হয়ে ওঠে। আজকের বিশ্বে আমরা দেখি—
- রাষ্ট্র ধর্মকে ব্যবহার করছে রাজনৈতিক বৈধতা পেতে
- কেউ ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ তৈরি করছে
- কেউ “রাষ্ট্রীয় ইসলাম”, “রাষ্ট্রীয় ধর্মীয় মূল্যবোধ” চাপিয়ে দিচ্ছে
দীন-ই-ইলাহী ছিলো এর উল্টো—
- এটি কোনো একক ধর্ম চাপায়নি
- সব ধর্মকে রাষ্ট্রের নিচে আনতে চেয়েছে
- ধর্মকে ব্যক্তিগত অনুশীলন রেখে রাষ্ট্রকে নৈতিক কর্তৃত্ব দিতে চেয়েছে
আজকের অনেক রাষ্ট্র যেখানে ধর্মকে ক্ষমতার অস্ত্র বানাচ্ছে, আকবর সেখানে ধর্মীয় ক্ষমতাকেই রাষ্ট্রের অধীনে আনতে চেয়েছিলেন।
সমালোচনা
আকবর পুরোপুরি মুক্তচিন্তক ছিলেন—এমন বলা ঠিক নয়। দীন-ই-ইলাহীর মধ্যেও ছিল—
- সম্রাটকেন্দ্রিক কর্তৃত্ব
- গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের অভাব
- জনগণের মতামতের অনুপস্থিতি
অর্থাৎ, এটি সহনশীল হলেও গণভিত্তিক ছিলো না।
উপসংহার
দীন-ই-ইলাহী কোনো নতুন ধর্ম নয়, কোনো ধর্মবিরোধী ষড়যন্ত্রও নয়। এটি ছিল— মধ্যযুগের এক ব্যতিক্রমী রাষ্ট্রচিন্তা, ধর্ম ও ক্ষমতার সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের প্রচেষ্টা এবং এক সম্রাটের সীমাবদ্ধ কিন্তু সাহসী বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা।
আজ, যখন ধর্ম ও রাজনীতি আবার মুখোমুখি সংঘাতে জড়াচ্ছে, দীন-ই-ইলাহী আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ধর্মের নামে রাষ্ট্র নয়, রাষ্ট্রের ভেতরে নৈতিকতা—এটাই ছিলো আকবরের প্রকৃত লক্ষ্য।
আরও পড়ুনঃ
১। শিখ ধর্ম: মধ্যযুগীয় ভারতের ধর্মীয় সংঘাতের ভেতর প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরে বিশ্বাসী এক সমন্বয়বাদী ধর্ম
২। হিন্দুধর্ম: প্রাচীন সভ্যতা থেকে বৈশ্বিক উপস্থিতি ও সমকালীন রাজনীতির কেন্দ্রে







Leave a Reply