বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভিন্ন দলের আলাদা নির্বাচনী প্রতীক রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী তাদের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করে এবং কখনো কখনো সমর্থকদের কাছে বলা হয়—এটি ন্যায়বিচারের প্রতীক, এমনকি কোরআনে এর উল্লেখ আছে।
প্রশ্ন হলো, কোরআনে কি সত্যিই দাঁড়িপাল্লাকে কোনো রাজনৈতিক প্রতীক বা “আল্লাহর মার্কা” হিসেবে বলা হয়েছে?
সংক্ষেপে উত্তর: না। কোরআনে দাঁড়িপাল্লা বা মিজান (ওজনের পাল্লা) এসেছে ন্যায়বিচার, ভারসাম্য ও হিসাবের প্রতীক হিসেবে—রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে নয়।
কোরআনে “মিজান” বা দাঁড়িপাল্লার ধারণা
কোরআনে কয়েকটি স্থানে মিজান (ميزان)—অর্থাৎ ওজনের পাল্লা বা ন্যায্য পরিমাপ—উল্লেখ করা হয়েছে। এসব আয়াত মানুষের নৈতিকতা, বিচার ও পরিমাপে সততার শিক্ষা দেয়।
১। ন্যায়ের উপর অটল থাকার নির্দেশ
সূরা আল-মায়িদা (৫:৮)
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াও…”
এখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নৈতিক দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে।
দাঁড়িপাল্লার প্রতীকী ধারণার সঙ্গে এটি ভাবগতভাবে সম্পর্কিত হলেও
কোনো দলীয় প্রতীক নির্ধারণের নির্দেশ এখানে নেই।
২। মাপে ও ওজনে পূর্ণতা আনার নির্দেশ
সূরা আল-ইসরা (১৭:৩৫)
“তোমরা যখন মাপ দাও, পূর্ণ মাপ দাও এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করো—
এটাই উত্তম এবং পরিণামে সুন্দর।”
এটি সামাজিক লেনদেনে ন্যায্যতার নীতি নিশ্চিত করে।
৩। ওজনে কম না দেয়ার নির্দেশ
সূরা আর-রহমান (৫৫:৭–৯)
“তিনি আকাশকে উঁচু করেছেন এবং স্থাপন করেছেন মিজান,
যাতে তোমরা মাপে সীমালঙ্ঘন না করো।
ন্যায়ভাবে ওজন কায়েম করো এবং মিজানে কম দিও না।”
এখানে মিজান স্পষ্টভাবে ন্যায় ও ভারসাম্যের নীতি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
অতএব, সমাজের সকল মানুষের প্রতি, সকল সম্প্রদায়ের প্রতি ন্যায়ানুগ আচরণ করা।
৪। শেষ বিচারে আল্লাহ যেভাবে ন্যায় বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন
সূরা আল-আম্বিয়া (২১:৪৭)
“কিয়ামতের দিনে আমি ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব; ফলে কারও প্রতি সামান্যতম অবিচার করা হবে না।”
এই আয়াতে দাঁড়িপাল্লা এসেছে পরকালের বিচারব্যবস্থার প্রতীক হিসেবে। অর্থাৎ আল্লাহ সকলের প্রতি ন্যায় বিচার করবেন।
কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজে দেখা যাচ্ছে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বললেই সে দুস্কৃতিকারী।
৫। আল্লাহর বিচার হবে সত্যের ভিত্তিতে
সূরা আল-আ‘রাফ (৭:৮–৯)
“সেদিন ওজন হবে সত্যের ভিত্তিতে… যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম, আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে।”
এখানেও পাল্লা মানুষের কর্মফলের ন্যায়সংগত মূল্যায়ন বোঝায়।
অর্থাৎ প্রত্যেকে তার কর্মফল অনুযায়ী ফল পাবেন। ন্যায় কাজ করে থাকলে ভালো ফল, অন্যায় করে থাকলে মন্দ ফল।
৬। ওজনে কম দেয়ার ফল
সুরা আল-মুতাফ্ফিফীন (৮৩:১–৩)
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়… যখন তারা নেয় পূর্ণ নেয়, আর যখন দেয় কম দেয়।”
এটি সরাসরি লেনদেনে অসততার নিন্দা।
কিন্তু আমরা যারা ধর্মের দোহাই দিয়ে রাজনীতি করি, তারা কি সততার সাথে লেনদেন করি? সুযোগ পেলেই একজন আরেকজনকে ঠকাচ্ছি, আরেকজনের নামে কুৎসা রটাচ্ছি- ওদিকে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।
রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবে কি কোনো নির্দেশ আছে?
উপরের কোনো আয়াতেই দাঁড়িপাল্লাকে—কোনো দলীয় প্রতীক, ভোটের চিহ্ন, বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের নিদর্শন নাই। দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে আল্লাহ সেটা ন্যায়ের পক্ষে গণনা করবেন এমন কথাতো নাইই।
বরং এটি একটি নৈতিক প্রতীক, যা ন্যায়বিচার, ভারসাম্য ও সততার শিক্ষা দেয়।
তাহলে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক ব্যবহারের অর্থ কী?
কোনো রাজনৈতিক দল ন্যায়বিচারের ভাবধারা বোঝাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক বেছে নিতে পারে—এটি একটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত।
কিন্তু সেই প্রতীককে সরাসরি কোরআনিক নির্দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক ব্যাখ্যা নয়, বরং গোনাহ’র কাজ।
উপসংহার
- কোরআনে মিজান/দাঁড়িপাল্লা এসেছে ন্যায়বিচার ও কর্মফলের প্রতীক হিসেবে।
- এটি পরকালীন বিচার ও নৈতিক ভারসাম্য বোঝায়।
- রাজনৈতিক প্রতীক বা ভোটের মার্কা হিসেবে দাঁড়িপাল্লার কোনো কোরআনিক নির্দেশ নেই।
সুতরাং বলা যায়, দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করা একটি দলের নিজস্ব নির্বাচনের প্রতীকী—ধর্মীয় বিধান নয়।
আরও পড়ুনঃ দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্ম, রাজনীতি ও সমাজ: ইতিহাস থেকে বর্তমান







Leave a Reply