বিশ্বব্যাপী ইসলামভীতি বাড়ছে কেন? প্রশ্নটা আমাদেরও ভাবতে হবে

ইসলাম নিয়ে বিশ্ববাসীর ভীতি বাড়ছে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আমরা যত বলি, “ইসলাম শান্তির ধর্ম”, বিশ্বের একটি অংশ ততই প্রশ্ন তুলছে- ইসলাম কি সত্যিই শান্তির ধর্ম, নাকি এর নামে এমন একটি আগ্রাসী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা আধুনিক মানবসভ্যতার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক? এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ বাস্তবতা হলো, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন […]

ইসলাম নিয়ে বিশ্ববাসীর ভীতি বাড়ছে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। আমরা যত বলি, “ইসলাম শান্তির ধর্ম”, বিশ্বের একটি অংশ ততই প্রশ্ন তুলছে- ইসলাম কি সত্যিই শান্তির ধর্ম, নাকি এর নামে এমন একটি আগ্রাসী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা আধুনিক মানবসভ্যতার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?

এই প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কারণ বাস্তবতা হলো, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কিছু ধর্মীয় বক্তা ও ইমামের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী বক্তব্য, জিহাদের আহ্বান, শিশুবিবাহের পক্ষে অবস্থান এবং ইহুদিসহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের সে দেশ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে।

একজনের বক্তব্য দিয়ে অবশ্যই পুরো ইসলাম বা কোটি কোটি মুসলমানকে বিচার করা যায় না। কিন্তু একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটলে প্রশ্ন উঠবেই- সমস্যাটা কোথায়?

বিজ্ঞান বহু আগেই দেখিয়েছে, অল্প বয়সে বিয়ে একজন শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। তাহলে ধর্মের নামে শিশুবিবাহকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা কেন থাকবে?

নবীজি কি সত্যি ৬ বছরের আয়েশা(রা:)কে বিয়ে করেছিলেন? যদি করতেন, তাহলে পালক পুত্রের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীকে বিয়ে সহ অনেক পারিবারিক বিষয় আল্লাহ যেমন কোরআনে বর্ণনা করেছেন, তেমনি বিবি আয়েশার বিয়ের বিষয়টাও হয়তো করতেন।

ঈশ্বরের সৃষ্টি মানুষ কি শুধু তার ধর্ম বা বিশ্বাসের কারণে ঘৃণার পাত্র হতে পারে?

তুমি যদি মানবতার কথা বলো, তাহলে তোমার মুখ থেকে মানবতার ভাষাই শোনা উচিত। সেখানে যদি বারবার আসে হত্যা, জিহাদ, বিধর্মীকে দমন, নাস্তিককে শাস্তি কিংবা ভিন্নমতাবলম্বীর বিরুদ্ধে ঘৃণার ভাষা- তাহলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

আর একটি বড় প্রশ্ন হলো- নিজের দেশে যে সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, সেই সমাজব্যবস্থার সঙ্গে মতের অমিল থাকলে অনেকে কেন বিদেশে চলে যান এবং সেখানকার সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও আইনের সুরক্ষা ভোগ করেন?

কিন্তু সেই বিদেশের সমাজেই শক্তি অর্জনের পর কেউ যদি বলতে শুরু করেন- এটি দারুল হারব, এখানে জিহাদ করতে হবে, এখানেও নিজেদের ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দিতে হবে- তাহলে আতঙ্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

ডালাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে মুসলিম জনসংখ্যা ও মসজিদের সংখ্যা বাড়ছে- এটি কোনো সমস্যা নয়। ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি সভ্য সমাজের স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু যখন কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠী নিজেদের জন্য আলাদা সামাজিক কাঠামো বা বিচ্ছিন্ন অঞ্চল গড়ে তোলার দাবি করে এবং সেটিকে স্থানীয় আইন ও সামাজিক ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করাতে চায়, তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- এটি কি সহাবস্থান, নাকি বিচ্ছিন্নতার পথে যাত্রা?

একইভাবে আমাদের দেশেও ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন থাকবে, তেমনি অন্য নাগরিকের স্বাধীনতাও থাকবে।

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন কেউ মনে করেন- তার ধর্মীয় ব্যাখ্যাই চূড়ান্ত; তাই অন্যের অনুষ্ঠান বন্ধ করা যাবে, অন্যের মাইক বন্ধ করা যাবে, অন্যের পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে, অন্যের বিশ্বাসকে ‘বাতিল’ ঘোষণা করা যাবে কিংবা কাউকে নাস্তিক, মুরতাদ বা কাফের আখ্যা দিয়ে সামাজিকভাবে হেয় করা যাবে।

একজন নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা যেমন আছে, তেমনি অন্য নাগরিকেরও মতপ্রকাশ, সংস্কৃতি, সংগীত ও সামাজিক অনুষ্ঠানের অধিকার আছে।

মাদ্রাসা, মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাইকের ব্যবহার নিয়েও একই কথা প্রযোজ্য। আজান বা ধর্মীয় প্রয়োজনের বিষয় এক জিনিস; কিন্তু অনুষ্ঠানস্থল থেকে শুরু করে পার্শ্ববর্তী চারিদিকে ৫০০-৭০০ মিটারব্যাপী মাইক লাগিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ শব্দে ওয়াজ, নসিহত কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠান প্রচার করে অসুস্থ মানুষ, শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ বা সাধারণ নাগরিকের বিশ্রামে বিঘ্ন ঘটানো অন্য বিষয়।

বিজ্ঞানসম্মতভাবে শব্দদূষণের ক্ষতি প্রমাণিত। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হোক কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠান- সবার জন্য একই নিয়ম হওয়া উচিত।

কিন্তু বাস্তবে আমরা কখনো দেখি, কোনো সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাইক ব্যবহার হলেই একদল ধর্মীয় কর্মী সেটিকে ‘বিদআত’, ‘হারাম’ ইত্যাদি বলে বন্ধ করার চেষ্টা করেন। অথচ নিজেদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা ওয়াজের সময় একই শব্দদূষণের বিষয়টি তারা বিবেচনায় আনেন না।

এটি ধর্মীয় আদর্শ নয়; এটি দ্বৈত মানদণ্ড।

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের খবর এসেছে, সেটিও আমাদের ভাবতে বাধ্য করে- ধর্মীয় পরিচয় বা ছাত্র পরিচয় কি কাউকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার দেয়?

কেউ পুলিশের আচরণে ক্ষুব্ধ হলে তার বিচার পাওয়ার জন্য আইনগত পথ আছে। পুলিশ অন্যায় করলে তারও জবাবদিহি থাকতে হবে। কিন্তু পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি অনুষ্ঠান পণ্ড করার চেষ্টা কিংবা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়াকে কোনোভাবেই ধর্মীয় অধিকার হিসেবে দেখানো যায় না।

আর ‘কোমলমতি ছাত্র’ পরিচয়ও কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো—ধর্ম যার যার, অধিকার সবার।

কে নাস্তিক, কে মুরতাদ, কে সুফি, কে অন্য মতের- এই বিচার করার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে দেওয়া যায় না। একজন মানুষ ভুল করলে তার বিচার রাষ্ট্রের আইন করবে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী আমরা যদি মনে করি, সৃষ্টিকর্তা মানুষের কর্মের হিসাব নেবেন, তাহলে সেই বিশ্বাসের সঙ্গে অন্য মানুষের ওপর নিজের হাতে শাস্তি প্রয়োগের প্রবণতা কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

আপনি বিশ্বাস করেন আল্লাহ সব দেখেন, মানুষের কর্মের হিসাব নেন- তাহলে অন্য মানুষের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার দায়িত্ব আপনাকে কে দিল?

সভ্য সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বাধীনতা থাকবে। একই সঙ্গে থাকবে অন্যের বিশ্বাস না করার স্বাধীনতা, ভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং নিজের জীবন নিজের মতো পরিচালনার অধিকার। আপনি যে ধর্ম পালন করেন, আপনার ধর্মের প্রতিটা মানুষ কি একইভাবে করে? না। একই ধর্মের হলেও, প্রত্যেকে তার নিজ নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী ধর্ম পালন করে।

এই সীমারেখাটি বুঝতে না পারলে ক্ষতি শুধু অন্যদের নয়- ক্ষতি হবে মুসলমানদেরও।

কারণ উগ্র কয়েকজন মানুষের আচরণের দায় শেষ পর্যন্ত পড়ে অসংখ্য নিরীহ, শান্তিপ্রিয় ও শিক্ষিত মুসলমানের ওপর। যারা নিজের ধর্ম পালন করেন, অন্যের ধর্মকে সম্মান করেন এবং দেশের আইন মেনে চলেন- তাঁরাও তখন সন্দেহের চোখে পড়েন।

এটাই সবচেয়ে দুঃখজনক।

তাই আজ মুসলমান সমাজের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠতে হবে—

ধর্ম কি মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার অস্ত্র, নাকি মানুষকে আরও মানবিক করার শিক্ষা দিয়েছে?

অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা যায় না। ভয় দেখিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা যায় না। ঘৃণা ছড়িয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

নিজের ধর্ম পালন করুন, অন্যের অধিকারকে সম্মান করুন। নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকুন, কিন্তু অন্যের বিশ্বাসের ওপর জোর খাটাবেন না।

নিজের চরকায় তেল দেওয়ার অর্থ ধর্মকে পরিত্যাগ করা নয়; বরং নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্য মানুষের স্বাধীনতাকেও সম্মান করা।

মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে।

কারণ মনুষ্যত্বহীনতা কোনো ধর্মের সৌন্দর্য নয়। বরং ধর্মের নামে মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দেওয়াই ধর্মের সবচেয়ে বড় পরাজয়।

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার বিয়েঃ সামাজিক পরিবর্তন, আইনি জটিলতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top