বঙ্গোপসাগরের দাবার বোর্ডে বাংলাদেশ

ভারত কেন ঢাকাকে হারাতে চাইবে না বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক হিসাব নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ চীনের দিকে চলে গেলে ভারত ও আমেরিকার প্রভাব কমে যাবে, বঙ্গোপসাগরে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হবে। কথাটির মধ্যে সত্য আছে। কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য যোগ করা দরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে শুধু […]

ভারত কেন ঢাকাকে হারাতে চাইবে না

বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক হিসাব নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাংলাদেশ চীনের দিকে চলে গেলে ভারত ও আমেরিকার প্রভাব কমে যাবে, বঙ্গোপসাগরে চীনের অবস্থান শক্তিশালী হবে।

কথাটির মধ্যে সত্য আছে।

কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য যোগ করা দরকার।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে শুধু ভারত-আমেরিকা বনাম চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাংলাদেশের বাস্তবতাটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

কারণ ভারত বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি পরাশক্তি নয়।

ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী, সবচেয়ে কাছের বৃহৎ প্রতিবেশী এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা রাষ্ট্র।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ভারতের সহযোগিতা ছিল ঐতিহাসিক। ভারত মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে সরাসরি দাঁড়িয়েছিল। ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালে দুই দেশ শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিও করে।

এই ইতিহাসকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করা যায় না।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা—ভূগোল

মানচিত্রের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।

বাংলাদেশের তিন দিক প্রায় ভারত দিয়ে ঘেরা।

ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার—যা ভারতের কোনো প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত। পূর্বদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত মাত্র প্রায় ২৭১ কিলোমিটার। বাকি দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

অর্থাৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তা, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এটি কোনো রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়।

এটি ভূগোলের বাস্তবতা।

আর ভূগোল বদলানো যায় না।

বঙ্গোপসাগরও শুধু বাংলাদেশের নয়

বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।

কিন্তু বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক ভূরাজনীতিতে ভারতও একটি বড় অংশীদার। ভারত ও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং পরে দুই দেশ বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি ও সামুদ্রিক সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার কথা বলেছে।

তাই বাংলাদেশ যদি হঠাৎ করে এমন কোনো শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে যায়, যে শক্তিকে ভারত তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে, তাহলে দিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

বরং সেটিই স্বাভাবিক।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও গভীর

ভারত বাংলাদেশের নিকটতম বড় বাজারগুলোর একটি।

ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৫.৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করছিল। ভারত থেকে জ্বালানি ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যও বাংলাদেশে আসে। ভারত বাংলাদেশকে অবকাঠামো উন্নয়নে কয়েকটি বড় ঋণসুবিধাও দিয়েছে।

খাদ্য, তুলা ও বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ—অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

অর্থাৎ ভারতকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি চালানোর কথা যারা বলেন, তারা আসলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেন।

আছে গঙ্গা, তিস্তা এবং অভিন্ন নদীর প্রশ্ন

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদীর সংখ্যা অনেক।

গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি রয়েছে, যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হয়ে যাবে। পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামীলীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে  ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ডিসেম্বরে নবায়নের প্রশ্ন আছে। তিস্তার পানি বণ্টন এখনো অমীমাংসিত।

এখানে বাংলাদেশের ন্যায্য পানির হিস্যা অবশ্যই বাংলাদেশের অধিকার।

কিন্তু সেই অধিকার আদায়ের পথ হওয়া উচিত আলোচনা ও কূটনীতি, ভারতবিরোধিতা নয়।

কারণ নদীর পানি কোনো সীমান্ত মানে না।

উজানে ভারত, ভাটিতে বাংলাদেশ—এই বাস্তবতা দুই দেশকে সহযোগিতা করতেই বাধ্য করে।

তাই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয়; বরং শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে আদায় করতে পারে।

ভারত বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে এতো চিন্তিত কেন?

এখানেই ৫ আগস্টের পরের পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। একই সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও দ্রুত উষ্ণ হতে শুরু করে।

২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ঢাকায় আসেন—প্রায় ১৩ বছর পর পাকিস্তানের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফর। তিনি শুধু সরকারের সঙ্গে নয়, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করেন।

পাকিস্তান-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়। দুই স্বাধীন দেশের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকতেই পারে। কিন্তু ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটি অন্য জায়গায়।

১৯৭১ সালে যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বাংলাদেশের জন্ম, সেই পাকিস্তানের সঙ্গে যদি বাংলাদেশ সামরিক, গোয়েন্দা বা কৌশলগত সম্পর্ক এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যা ভারতের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে, তাহলে দিল্লির উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়

ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক বহু দশক ধরে সংঘাতপূর্ণ।

কাশ্মীর থেকে সীমান্ত নিরাপত্তা—বিভিন্ন বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।

তাই বাংলাদেশের ভূখণ্ড যদি ভবিষ্যতে কোনোভাবে পাকিস্তান-সমর্থিত বা পাকিস্তানঘনিষ্ঠ কোনো নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে যায়, তাহলে ভারতের জন্য সেটি নিঃসন্দেহে একটি বড় নিরাপত্তা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষ করে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায়।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশের একেবারে পাশেই।

বাংলাদেশের ভেতরে কোনো উগ্রবাদী বা সশস্ত্র সংগঠন শক্তিশালী হলে তার প্রভাব ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতেও পড়তে পারে।

এ কারণেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থার সম্ভাব্য উত্থান ভারতের কাছে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়—এটি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তারও বিষয়।

৫ আগস্টের পর উগ্রপন্থার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেও দেখা গেছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে কিছু ইসলামপন্থী ও উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যাসাইলাম এজেন্সির ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইসলামপন্থী উপাদানগুলোর পুনরুত্থান দেখা গেছে এবং কিছু উগ্রপন্থী সংগঠনের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ার বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্লেষকের উদ্বেগ ছিল। কিছুদিন আগে ইজরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ অভিযোগ করে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান-এ ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বা সংশ্লিষ্টতা আছে এবং তাদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদা বাংলাদেশে সেল বা ঘাটি গড়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

এখানে ভারতের উদবিঘ্ন হওয়ার কারণ বোঝা কঠিন নয়।

ভারত তার পূর্ব সীমান্তে এমন কোনো বাংলাদেশ চায় না, যেখানে উগ্রবাদী সংগঠনগুলো নিরাপদ আশ্রয়, অর্থ বা সাংগঠনিক সুবিধা পেতে পারে।

এটি ভারতের স্বার্থ এবং বাংলাদেশের স্বার্থও। কারণ জঙ্গিবাদ শেষ পর্যন্ত কোনো দেশের বন্ধুত্ব মানে না।

আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে স্থিতিশীল বাংলাদেশ সম্ভব?

এখানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রশ্নটি এসে যায়।

আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের বৃহত্তম ও ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব, স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন এবং পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে দলটির সম্পর্ক গভীর।

কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। যে অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো, বর্তমান সরকার সেটির সাংবিধানিক বৈধতা দেয়।

এখন প্রশ্ন হলো—একটি দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে কতটা অংশগ্রহণমূলক ও দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব?

ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ দিল্লি তার সীমান্তে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাইবে, যেখানে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীল থাকবে।

একটি অস্থির, বিভক্ত এবং উগ্রপন্থার ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ ভারতের জন্য কোনোভাবেই ভালো প্রতিবেশী নয়।

শেখ হাসিনার বিচারও ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের বড় বিষয়

শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।

বাংলাদেশ তাকে ফেরত চেয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি সেই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণের অনুরোধ তারা তাদের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরীক্ষা করছে।

ফলে শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নন।

তিনি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেরও একটি বড় কূটনৈতিক ইস্যু।

ভারতের সামনে তাই কঠিন হিসাব:

একদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে।

অন্যদিকে শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ দাবি।

আবার একই সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও ভারতের স্বার্থ।

এখানেই তারেক রহমানের দিল্লি সফর গুরুত্বপূর্ণ

এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে তাই আমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

১৬ আগস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ জানিয়েছে—বর্তমান পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ প্রয়োজন। দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।

দিল্লি অবশ্যই চাইবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে।

কারণ ভারত জানে—

বাংলাদেশকে দূরে ঠেলে দিয়ে ভারত নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

বরং ভারত চায় এমন একটি বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ থাকবে, কিন্তু নিজের স্বাধীনতা বজায় রাখবে; ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করবে, কিন্তু ভারতের পুতুল হবে না।

এটাই হওয়া উচিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্বাভাবিক ভিত্তি।

এখানেই আসে চীন প্রসঙ্গ

চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার।

বাংলাদেশের অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প ও বিভিন্ন প্রকল্পে চীনের ভূমিকা রয়েছে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক থাকা নিয়ে ভারতের আপত্তি থাকার কথা নয়, ছিলোও না।

সমস্যা তৈরি হবে তখনই, যখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে এমন পর্যায়ে যাবে যে বাংলাদেশ চীনের কৌশলগত বা সামরিক বলয়ের অংশ হয়ে পড়বে।

কারণ তখন শুধু ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন হবে।

আর এখানেই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের মিল।

ভারত ও আমেরিকা বন্ধু নয়, কৌশলী মিত্র

ভারত কখনোই আমেরিকার বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলো না। ১৯৭১ সালে ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে, পক্ষান্তরে আমেরিকা ছিলো তার বিরোধী। ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে।

চীনকে মোকাবিলা করতে আমেরিকার ভারতকে প্রয়োজন।

ভারতেরও চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা প্রয়োজন।

কিন্তু ভারত কখনোই আমেরিকার অধীন রাষ্ট্র নয়।

ভারত নিজের স্বার্থেই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, চীনের সঙ্গেও বাণিজ্য করে।

তাই বাংলাদেশকে নিয়ে ভারত-আমেরিকার অবস্থান সবসময় এক হবে—এমন নয়।

তবে একটি জায়গায় তাদের স্বার্থ স্পষ্টভাবে মিলে যায়:

বঙ্গোপসাগর যেন চীনের একচ্ছত্র কৌশলগত প্রভাবের এলাকায় পরিণত না হয়।

ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের লাভ কী?

এখানেই আমার আপত্তি রয়েছে সেই রাজনৈতিক যুক্তির সঙ্গে, যেখানে ভারতকে বাংলাদেশের প্রধান শত্রু হিসেবে দেখানো হয়।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেক সমস্যা আছে।

সীমান্তে হত্যা আছে।

তিস্তার পানি আছে।

বাণিজ্য ঘাটতি আছে।

অনেক বিষয়ে ভারতের নীতির সমালোচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে।

কিন্তু তাই বলে ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড় করানো ইতিহাস ও ভূগোল—দুটিরই প্রতি অবিচার।

পাকিস্তান বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল। ভারত বাংলাদেশের জন্মের পাশে দাঁড়িয়েছিল।

এই পার্থক্য কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মুছে ফেলা যায় না।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে—কিন্তু ইতিহাস ভুলে নয়

বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখবে—এটাই স্বাভাবিক।

বাণিজ্য করবে, যোগাযোগ করবে, জনগণের মধ্যে সম্পর্ক বাড়াবে—এসবও স্বাভাবিক।

কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর অর্থ যদি ১৯৭১-এর ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া হয়, কিংবা পাকিস্তানের সামরিক ও কৌশলগত স্বার্থকে বাংলাদেশের নিরাপত্তার ওপর স্থান দেওয়া হয়, তাহলে সেটি হবে ভয়ংকর ভুল।

বিশেষ করে ভারতকে ঘিরে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা চিন্তা বিবেচনা করলে।

বাংলাদেশের ভূখণ্ড কখনোই ভারতবিরোধী কোনো শক্তির কৌশলগত ঘাঁটি হতে পারে না।

এটি বাংলাদেশের নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেও বলা দরকার।

তাহলে বাংলাদেশের পথ কোনটি?

আমার মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো—

চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে।

আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।

পাকিস্তানের সঙ্গেও স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে।

কিন্তু ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বিশেষ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক

কারণ ভারত আমাদের সবচেয়ে কাছের বৃহৎ প্রতিবেশী।

১৯৭১-এর রক্তের সম্পর্ক আছে।

চার হাজার কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত আছে।

অভিন্ন নদী আছে।

বাণিজ্য আছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আছে।

যোগাযোগ আছে।

বঙ্গোপসাগর আছে।

আর আছে নিরাপত্তার অভিন্ন স্বার্থ।

শেষ কথা

বাংলাদেশকে নিয়ে আজ ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব আছে—এটা সত্য।

কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবটি হওয়া উচিত নিজের জাতীয় স্বার্থের।

আমরা চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব—কিন্তু চীনের বলয়ে যাব না।

আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব—কিন্তু আমেরিকার নির্দেশে চলবো না।

পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখব—কিন্তু ১৯৭১-এর ইতিহাস ভুলবো না।

আর ভারতের সঙ্গে রাখবো নিবির বন্ধুত্ব—কারণ ভারত আমাদের সবচেয়ে কাছের বড় প্রতিবেশী, মুক্তিযুদ্ধের সহযোগী এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত দেশ।

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব মানে ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ নয়।

বরং শক্তিশালী বাংলাদেশই ভারতের সবচেয়ে ভালো প্রতিবেশী।

আর ভারতেরও মনে রাখা উচিত—বাংলাদেশ কোনো ছোট ভাই নয়, কোনো করদ রাজ্য নয়; বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র।

দুই দেশের সম্পর্ক হওয়া উচিত সমমর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের ভিত্তিতে।

এই সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, ততই দুর্বল হবে সেই শক্তিগুলোর সুযোগ—যারা বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে, আর ভারতকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে খেলতে চায়।

আজকের ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তাই কোনো এক পরাশক্তির ছায়ায় দাঁড়ানো নয়।

ভারতকে পাশে রেখে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য রেখে, আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা রেখে—নিজের জাতীয় স্বার্থে নিজের পথ নিজেই ঠিক করা।

আর এই পথের প্রথম শর্ত হলো—

বাংলাদেশ যেন আর কখনো পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক বলয়ের দিকে ফিরে না যায়।

১৯৭১ আমাদের যে স্বাধীনতা দিয়েছে, সেই স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা এটাই—
বন্ধুত্ব করা যায় সবার সঙ্গে, কিন্তু নিজের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।

আরও পড়ুনঃ ২০৩০ সালে কি আবার সেই ধ্বংসযজ্ঞ হবে? শত বছর আগের রহস্য কি সত্যিই কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top