বম (Bawm) বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তারা প্রধানত বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করে। ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনধারার দিক থেকে বমরা পার্বত্য এলাকার তিব্বত-বার্মা ভাষাভিত্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত হলেও তাদের নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় রয়েছে।
আগমন ও উৎপত্তি
গবেষকদের মতে—
- বম জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষরা বহু শতাব্দী আগে বর্তমান মিয়ানমার ও আশপাশের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।
- তারা ঐতিহাসিকভাবে গোষ্ঠীভিত্তিক ও স্বশাসিত পাহাড়ি সমাজব্যবস্থা বজায় রেখেছিল।
- পার্বত্য অঞ্চলের অন্যান্য কুকি-চিন জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সাদৃশ্য দেখা যায়।
ধর্মবিশ্বাস
বম সমাজে ধর্মীয় পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য—
- অতীতে তারা প্রধানত প্রকৃতি-নির্ভর লোকবিশ্বাস ও প্রাণবাদী ধর্মাচার অনুসরণ করতো।
- উনিশ ও বিশ শতকে খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রভাবে অধিকাংশ বম বর্তমানে খ্রিস্টধর্ম (বিশেষত প্রোটেস্ট্যান্ট ধারার) অনুসারী।
- ধর্মীয় সংগীত, গির্জাকেন্দ্রিক সামাজিক জীবন ও উৎসব তাদের সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ভাষা
বম ভাষা তিব্বত-বার্মা ভাষাপরিবারভুক্ত এবং কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত।
- দৈনন্দিন জীবনে মাতৃভাষার ব্যবহার বজায় থাকলেও শিক্ষা ও প্রশাসনিক যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- ভাষা সংরক্ষণে লিখিত রূপ ও সাহিত্যচর্চার উদ্যোগও দেখা যায়।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- বসতি সাধারণত পাহাড়ের ঢালে নির্মিত বাঁশ-কাঠের উঁচু ঘর।
- ঐতিহ্যগত জীবিকা: জুম চাষ, শিকার, বনজ সম্পদ সংগ্রহ ও ক্ষুদ্র কৃষিকাজ।
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক রঙিন বোনা কাপড়নির্ভর; নারীদের বয়নশিল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- লোকগান, সমবেত সংগীত, নৃত্য ও সামাজিক উৎসব বম সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- খ্রিস্টীয় উৎসব—বিশেষ করে বড়দিন—সামাজিকভাবে আনন্দঘনভাবে পালিত হয়।
শিক্ষা
বম জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার প্রসার তুলনামূলকভাবে দ্রুত ঘটেছে, যার পেছনে মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা রয়েছে।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
- নতুন প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও সামাজিক নেতৃত্বে এগিয়ে আসছে।
বিবাহরীতি
- বিবাহ সাধারণত গোষ্ঠীর ভেতরে সামাজিক ও পারিবারিক সম্মতির ভিত্তিতে সম্পন্ন হয়।
- বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খ্রিস্টান ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী গির্জায় বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
- বিয়েতে ভোজ, সংগীত ও সামষ্টিক আনন্দ-অনুষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অংশ।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- বম সমাজ গোষ্ঠীকেন্দ্রিক, পারস্পরিক সহযোগিতানির্ভর ও ধর্মীয়ভাবে সংগঠিত।
- গ্রামভিত্তিক নেতৃত্ব, বয়োজ্যেষ্ঠদের মর্যাদা ও সামাজিক ঐক্য তাদের সমাজব্যবস্থার ভিত্তি।
- ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সামাজিক শিক্ষা, নৈতিকতা ও ঐক্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে বম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ১০–১৫ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়, যা তাদেরকে তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে।
উপসংহার
বম জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রকৃতি-নির্ভর প্রাচীন জীবনধারা, পরবর্তীকালে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ, বয়নশিল্প, সমবেত সংগীত ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক সামাজিক কাঠামো—সব মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও বমরা নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে।
আরও পড়ুনঃ তঞ্চংগ্যা জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের পরিচিতি







Leave a Reply