মারমা (Marma) বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আদিবাসী/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। তারা প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাস করে। ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকে মারমারা রাখাইন/আরাকান (বর্তমান মিয়ানমার) অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
আগমন ও উৎপত্তি
গবেষকদের মতে, মারমারা মূলত আরাকান অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করে।
- ১৬শ–১৮শ শতকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ ও শাসন পরিবর্তনের কারণে তারা ধীরে ধীরে বর্তমান বসতিতে স্থায়ী হয়।
- ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতিতে রাখাইন জনগোষ্ঠীর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ধর্মবিশ্বাস
মারমাদের অধিকাংশই থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম অনুসরণ করে।
- বৌদ্ধ পূর্ণিমা, প্রবারণা পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান ইত্যাদি তাদের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
- পাশাপাশি কিছু লোকজ বিশ্বাস, পূর্বপুরুষ স্মরণ ও প্রকৃতিনির্ভর আচার সামাজিক জীবনে বিদ্যমান।
ভাষা
মারমা ভাষা তিব্বত-বার্মা ভাষাপরিবারভুক্ত এবং রাখাইন/বার্মিজ ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
নিজস্ব বর্ণমালা থাকলেও বাস্তব জীবনে বাংলা ভাষার ব্যবহারও বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষা ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে।
সংস্কৃতি ও জীবনযাপন
- ঐতিহ্যবাহী পোশাক: নারীদের থামি ও আঙ্গি, পুরুষদের লুঙ্গি-ধরনের পোশাক।
- প্রধান উৎসব: সাংগ্রাই (নববর্ষ উৎসব), যা পানি উৎসব ও আনন্দঘন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হয়।
- জীবিকা: আগে জুম চাষ ছিল প্রধান; বর্তমানে কৃষি, ব্যবসা, পর্যটন ও চাকরিতে অংশগ্রহণ বাড়ছে।
- নৃত্য, সঙ্গীত, কাঠের স্থাপত্য ও বৌদ্ধ মন্দিরকেন্দ্রিক জীবনধারা মারমা সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শিক্ষা
মারমা সমাজে ধীরে ধীরে শিক্ষার প্রসার ঘটেছে।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- উচ্চশিক্ষা, সরকারি চাকরি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মারমা তরুণদের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় বেশি।
বিবাহরীতি
- সাধারণত পারিবারিক সম্মতি ও সামাজিক নিয়ম মেনে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
- বৌদ্ধ ভিক্ষুর উপস্থিতিতে ধর্মীয় আশীর্বাদ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
- বিয়েতে ভোজ, নৃত্য-গান ও আত্মীয়স্বজনের সমাগম সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করে।
সামাজিক রীতি ও প্রথা
- মারমা সমাজ গোষ্ঠীভিত্তিক ও প্রথানির্ভর।
- গ্রাম পরিচালনায় হেডম্যান, কারবারি ও প্রথাগত নেতৃত্বব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান, পারস্পরিক সহযোগিতা ও ধর্মীয় অনুশাসন সামাজিক জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে মারমাদের সংখ্যা আনুমানিক ২–৩ লক্ষের মধ্যে ধরা হয়, যা তাদেরকে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উপসংহার
মারমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস, বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধারক। রাখাইন উৎসভিত্তিক তাদের ভাষা-সংস্কৃতি, সাংগ্রাই উৎসব, জুমজীবন ও ধর্মীয় অনুশীলন—সব মিলিয়ে তারা একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে। আধুনিক শিক্ষা ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও মারমারা নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ চাকমা জনগোষ্ঠী: ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের সামগ্রিক পরিচিতি







Leave a Reply