বাংলাদেশের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিমেরু কাঠামোর মধ্যে আবর্তিত হয়েছে। একদিকে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। এই দুই দলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তা, ইতিহাসের ব্যাখ্যা এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রশ্নেও গভীরভাবে জড়িত।
ক্ষমতার পরিবর্তন ও জুলাই পরবর্তী প্রেক্ষাপট
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ঘিরে দেশে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একটি অন্তর্বর্তী বা অস্থায়ী সরকার গঠনের প্রেক্ষাপটে ক্ষমতার বৈধতা, জনসমর্থন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে গঠিত প্রশাসনকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মতভেদ দেখা দেয়।
সমালোচকদের মতে, এই সরকার শুরু থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী কার্যকলাপ দ্বারা জনআস্থার সংকটে ভুগছিলো। প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক সমন্বয়ের ঘাটতি—সব মিলিয়ে জনঅসন্তোষ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করা ছাড়া তাদের সামনে বাস্তবসম্মত আর কোনো বিকল্প ছি্লো না।
নির্বাচন ও অংশগ্রহণের প্রশ্ন
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক ছিলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর অংশগ্রহণ না থাকা। একটি দেশের প্রধান ঐতিহাসিক রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হলে সেই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। অতীতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন বর্জন করেছে—কিন্তু তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি, নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা প্রদান করা হয়নি। এই তুলনা অনেকের কাছে বর্তমান পরিস্থিতিকে বৈষম্যমূলক বলে প্রতীয়মান করে।
অন্যদিকে নির্বাচনী ফলাফল একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। আওয়ামী ভোটব্যাংকের বড় একটি অংশ, স্বাধীনতার প্রশ্নকে অগ্রাধিকার দিয়ে, কৌশলগতভাবে বিএনপির পক্ষে ভোট দেয়—এমন বিশ্লেষণও শোনা যায়। কারণ হিসেবে বলা হয়, যদি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি অথবা নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি ক্ষমতায় আসতো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাষ্ট্রের মৌলিক আদর্শ নিয়ে নতুন সংকট তৈরি হতে পারত।
ফলাফল হিসেবে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে—যা কেবল দলীয় শক্তির কারণে নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণের ফল বলেও অনেকে মনে করেন।
অতীতের গাঁটছড়া ও বর্তমানের বাস্তবতা
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অতীতে বিএনপি স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির সঙ্গে রাজনৈতিক জোট করেছে। এটি তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে রাজনীতির বাস্তবতা অনেক সময় দলগুলোকে নতুন অবস্থান নিতে বাধ্য করে। প্রশ্ন হচ্ছে—বর্তমান প্রেক্ষাপটে তারা কি সেই অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্যের পথে এগোতে পারবে?
একইভাবে আওয়ামী লীগের জন্যও আত্মসমালোচনার জায়গা রয়েছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে প্রশাসনিক কঠোরতা, বিরোধী দমনের অভিযোগ এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বৃদ্ধি পেয়েছিল—যা সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে বলে অনেকেই বলে থাকেন।
রাষ্ট্র বনাম প্রতিশোধের রাজনীতি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—প্রতিশোধমূলক রাজনীতি। যদি বিজয়ী পক্ষ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেয়া বিরোধী পক্ষকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, দমন বা হয়রানির পথে হাঁটে, তাহলে গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে। একইভাবে, বিরোধী পক্ষ যদি সরকার পতনের আন্দোলনে অবিলম্বে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে রাষ্ট্র আবারও অস্থিতিশীলতার চক্রে পড়বে।
অতএব, দুটি বড় দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম বোঝাপড়া প্রয়োজন। যেমন:
(১) আওয়ামী লীগের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
(২) নির্বাসিত নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনে ফেরার সুযোগ
(৩) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলোর পুনর্বিবেচনা
(৪) সংসদকে কার্যকর রাখা
(৫) দলীয় স্বার্থ নয়, দেশের স্বাধীনতা সার্ব্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকাোরের তালিকায় রাখা।
এগুলো কেবল একটি দলের স্বার্থে নয়—গণতন্ত্রের স্বার্থে। বিএনপি যদি স্বাধীনতার সত্য ইতিহাসের পথে হাঁটে, নিজের কর্মদক্ষতা দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে, তাহলে শুধু আওয়ামীলীগকেই স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল হিসেবে নয়, বিএনপিকেও বিকল্প হিসেবে আস্থায় নিতে পারে।
পাঁচ বছরের স্থিতিশীলতার প্রশ্ন
যে প্রকারেই হোক, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে একটি নির্বাচন হয়েছে, জগদ্দল পাথরের মতো অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসে থাকা ইউনুস অপসারিত হয়েছে এবং বিএনপিও দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছে, তাদের সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ পাওয়া উচিত। দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় আওয়ামীলীগ দেশ পরিচালনা করেছে, এই সময়কালে অনেক নতুন ভোটার হয়েছে তারা পূর্বের কোনো সরকারের শাসনকাল দেখেনি। এই ৫ বছরে তারা নতুন সরকারের কার্যক্রম দেখতে পাবে। ৫ বছর পর নতুন নির্বাচনে তারা পছন্দমত দল বেছে নিতে পারবে।
তবে সেই সুযোগের অর্থ “চেকবিহীন ক্ষমতা” নয়। গঠনমূলক সমালোচনা, সংসদীয় বিতর্ক এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা—এসবই গণতন্ত্রের অংশ, আর সেক্ষেত্রে অবশ্যই বড় দল আওয়ামীলীগকে মাঠে থাকতে হবে।
আওয়ামী লীগের জন্য কৌশলগতভাবে এই সময়টা হতে পারে পুনর্গঠন, সাংগঠনিক সংস্কার এবং রাজনৈতিক আত্মসমালোচনার সময়। সরকার পতনের আন্দোলনের চেয়ে শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়াই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। বিরোধিতার কারণে বিরোধিতা নয় সরকারের মন্দ কাজের সমালোচনা করে নিজেদের ভিত মজবুত করাই হবে সঠিক পদক্ষেপ।
আরো একটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে তা হলো, আবার যেনো কোনো অশুভ শক্তি দেশের মধ্যে “মব” কালচারের অবতারণা না করতে পারে সেজন্যে বড় দুই দলকে দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
স্বাধীনতার চেতনা: দলীয় নয়, জাতীয় প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাজনীতিতে “স্বাধীনতার চেতনা” কেবল একটি দলের সম্পত্তি নয়; এটি জাতীয় ঐতিহ্য। যদি এই চেতনাকে দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা বিভাজন সৃষ্টি করবে। বরং প্রয়োজন—মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক আদর্শ (গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা) সকল দলের ন্যূনতম অঙ্গীকারে পরিণত করা এবং এটা হতে পারে বিকৃত ইতিহাস চর্চা থেকে বিরত থাকলে।
উপসংহার
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট প্রশ্ন রাখে: আমরা কি প্রতিহিংসা ও বাদ-দেয়ার রাজনীতিতে ফিরবো, নাকি প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু সহনশীল গণতন্ত্রের পথে হাঁটবো?
বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি—বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—যদি রাষ্ট্রকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখে, তাহলে অবহ্যই স্থিতিশীলতা সম্ভব। আর যদি তারা অতীতের ক্ষতকে পুঁজি করে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চায়, তাহলে রাজনৈতিক অস্থিরতার চক্র চলতেই থাকবে।
এখন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বের—কিন্তু তার প্রভাব পড়বে পুরো জাতির উপর।






Leave a Reply