পৃথিবতে অদ্ভূত সব যুদ্ধের কথা শোনা যায়। এ ঘটনাটি আরো ব্যতিক্রম- একই ধর্মের দুই ধর্মগূরুর মধ্যে যুদ্ধ, যখন খ্রিস্টধর্মের সর্বোচ্চ আসনই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যুদ্ধে নামে।
ইতিহাসে যুদ্ধ মানেই সাধারণত দুই রাষ্ট্র, দুই রাজা কিংবা দুই ধর্মের সংঘর্ষ। কিন্তু ইউরোপের মধ্যযুগীয় ইতিহাসে এমন এক অদ্ভুত অধ্যায় আছে, যেখানে একই ধর্মের, একই গির্জার, এমনকি একই পদের—দুই পোপের সেনাবাহিনী মুখোমুখি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
এই ঘটনা ইতিহাসে পরিচিত “War of the Two Popes” নামে, যা মূলত পশ্চিমা খ্রিস্টধর্মের গভীর সংকট— পশ্চিমা বিভেদ (১৩৭৮–১৪১৭)–এর রক্তাক্ত প্রকাশ।
যুদ্ধের পটভূমি: এক গির্জা, দুই পোপ
১৩৭৮ সালে পোপ গ্রেগরি একাদশের মৃত্যুর পর রোমে নতুন পোপ নির্বাচন হয়। নির্বাচিত হন পোপ আরবান ষষ্ঠ (Urban VI)। কিন্তু খুব দ্রুতই কার্ডিনালদের একটি বড় অংশ অভিযোগ তোলে—এই নির্বাচন নাকি জনতার চাপে জোরপূর্বক করা হয়েছিল।
এর ফলাফল হয় ভয়াবহ—
(১) ফ্রান্সের অ্যাভিনিয়নে আলাদা করে আরেকজন পোপ নির্বাচিত হন- পোপ ক্লেমেন্ট সপ্তম (Clement VII)।
(২) ইউরোপ বিভক্ত হয়ে পড়ে দুই শিবিরে।
(৩) একদিকে রোমের পোপ, অন্যদিকে অ্যাভিনিয়নের পোপ, দুজনেই দাবি করেন—“আমিই আসল পোপ, বাকিটা অবৈধ।”
ধর্মীয় বিভাজন থেকে সামরিক সংঘর্ষ
এই দ্বন্দ্ব কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
দুই পোপই—
(১) নিজ নিজ সেনাবাহিনী গঠন করেন
(২) ইউরোপের রাজা ও সামন্তপ্রভুদের সমর্থন আদায় করেন
(৩) প্রতিপক্ষ পোপকে “অবৈধ” ও “পাপাচারী” ঘোষণা করেন
ফলে দেখা যায়—
(১) পোপের পক্ষে পোপের সেনা যুদ্ধ করছে
(২) ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা ক্যাথলিকদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র ধরছে
কোন দেশ কার পক্ষে ছিলো
এই যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিভাজনে ইউরোপ ভাগ হয়ে যায়—
রোমের পোপ (Urban VI) সমর্থন পেয়েছিলেন:
(১) ইংল্যান্ড
(২) জার্মানি
(৩) ইতালির বড় একটি অংশ
অ্যাভিনিয়নের পোপ (Clement VII) সমর্থন পেয়েছিলেন:
(১) ফ্রান্স
(২) স্পেন
(৩) স্কটল্যান্ড
(৪) নেপলসের অংশবিশেষ
এটা শুধু কূটনৈতিক সমর্থন ছিলো না— সৈন্য, অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছলো।
রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা
১৩৭৮ থেকে ১৩৮৯ সাল পর্যন্ত একাধিক সামরিক সংঘর্ষ ঘটে—
(১) ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ
(২) দুর্গ দখল
(৩) গির্জা লুট
(৪) সাধারণ মানুষ হত্যা
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক ছিল— একই ধর্মের যাজকেরা একে অপরকে ধর্মদ্রোহী ঘোষণা করে হত্যা করেছিলো।
ধর্মীয় কর্তৃত্বের চরম পতন
এই সংঘাতের ফলে—
(১) পোপের নৈতিক ও ধর্মীয় মর্যাদা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
(২) সাধারণ খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রশ্ন উঠে—
“যদি দুই পোপই নিজেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধি বলে, তাহলে আমরা কাকে মানবো?”
(৩) ইউরোপে চার্চের প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে নড়ে যায়
অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন—
এই বিভাজনই পরবর্তীতে প্রোটেস্ট্যান্ট সংস্কার আন্দোলনের (Reformation) পথ তৈরি করে।
বহু বছর পর সমাধান ও যুদ্ধের অবসান
এই বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটে অনেক পরে— ১৪১৭ সালে Council of Constance–এর মাধ্যমে একাধিক পোপকে অপসারণ করা হয়। নতুনভাবে একজন পোপ নির্বাচিত করা হয়। তবেই শেষ হয় পোপ বনাম পোপের যুদ্ধ।
ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা
“পোপের সেনাবাহিনী বনাম পোপের সেনাবাহিনী”— এটা শুধু একটি যুদ্ধ নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা। ধর্মীয় ক্ষমতা যখন রাজনৈতিক লোভে পরিণত হয়, তখন ধর্ম নিজেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অস্ত্র হয়ে ওঠে।
ইতিহাস এখানে দেখিয়েছে—
“নৈতিক কর্তৃত্ব হারালে সবচেয়ে পবিত্র প্রতিষ্ঠানও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।“
সূত্রঃ ইন্টারনেট
আরো পড়ুনঃ মৃত মানুষকে কবর থেকে তুলে এনে বিচার








Leave a Reply