বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICT) মৃত্যুদণ্ডাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনগত ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকেও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। রায়ে যেভাবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন, জাতিসংঘের রিপোর্ট, সংশোধিত আইন, থানা দমন-অভিযান এবং “command responsibility” অর্থাৎ আদেশ প্রদানের দায়িত্ব যুক্ত করা হয়েছে — তা বহু আইন বিশেষজ্ঞ প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন।
এই প্রবন্ধে সেই প্রশ্নগুলো আইনি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করবো।
জাতিসংঘ রিপোর্ট: রেফারেন্সের ব্যবহার বনাম প্রমাণযোগ্যতা
রায়ে UN Human Rights Office (OHCHR)–এর fact-finding রিপোর্টের উল্লেখ আছে।
এই রিপোর্টে বলা হয়েছিল:
- ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে দমন-অভিযানে প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হতে পারে।
- তবে রিপোর্টটি ছিল fact-finding এবং জাতিসংঘ স্পষ্ট জানিয়েছিল —
“এই প্রতিবেদন কোনো মামলার এভিডেন্স হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।”
তবুও ICT মামলায় এ রিপোর্টকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে — যা গ্রহণযোগ্যতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রশ্ন তোলে।
নিহত সংখ্যা ও তালিকার অসংগতি
- রায়ে নিহত ১৪০০ জন উল্লেখ থাকলেও
সরকার এখন পর্যন্ত ৮৩৬ জনের তালিকা প্রকাশ করেছে। - তাছাড়া তালিকায় শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পর সংঘটিত কিছু মৃত্যুও অন্তর্ভুক্ত — যা “আদেশ”-এর সময়সীমার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি করছে।
আইন সংশোধন ও Retroactivity: একটি বড় আইনি সংকট
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ঘটনাগুলো ঘটেছে:
- জুলাই—৫ আগস্ট ২০২৪
কিন্তু বিচার হয়েছে যে আইনে, সেই ICT Act-এর সংশোধন করা হয়: - ২৪ নভেম্বর ২০২৪ (অর্ডিন্যান্স ২০২৪)
- ২০২৫ সালের নতুন সংশোধনী (Second Amendment Ordinance 2025)
আইনগত প্রশ্ন:
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচার হলেও, অপরাধ যে সময় সংঘটিত হয়েছে
তার আগের আইনের ভিত্তিতে বিচার করতে হয়।
এটি আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মূল নীতি —
পূর্বপ্রযোজ্য নয় এমন আইন প্রয়োগ নিষিদ্ধ।
এখানে:
- নতুন সংশোধন আইন
- নতুন সংজ্ঞা
- নতুন অপরাধ কাঠামো
- নতুন command responsibility রুল
প্রয়োগ করা হয়েছে সেই সময়ের ওপর, যখন আইনগুলো কার্যকরই ছিল না।
এটি আন্তর্জাতিক আইন, ICC standard এবং Bangladesh Constitution —
তিন স্তরেই প্রশ্ন তৈরি করে।
রাষ্ট্রপতির অর্ডিন্যান্স: আইনের বৈধতা কি টেকে?
সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর রাষ্ট্রপতি ICT আইন সংশোধন করেন অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে।
সমস্যা তিনটি:
১. সংসদহীন অবস্থায় এত বড় আইন সংশোধনের এখতিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু এটি “emergency legislative power” —
বৃহৎ কাঠামোগত বিচারিক আইন সংশোধন সাধারণত সংসদীয় অনুমোদন দাবি করে।
২. সংশোধন সংসদে পাস হয়নি
অর্ডিন্যান্স সংসদে না গেলে এর স্থায়িত্ব ও বৈধতা অনিশ্চিত থাকে।
ফলে এই আইনে দেওয়া সাজা ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জে স্থায়ী নাও হতে পারে।
৩. নজির: আইন ব্যক্তিবিশেষ লক্ষ্য করে সংশোধন করা হচ্ছে
কয়েকটি সংশোধনী আদালত, আইনজীবী, ও আন্তর্জাতিক সংস্থার পর্যবেক্ষণে “ব্যক্তিবিশেষের জন্য নির্দিষ্ট নির্ধারিত আইন” হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
আত্মরক্ষার আইন বনাম দায় নির্ধারণ
রায়ে ৫ আগস্টের দুটি ঘটনাকে “হত্যা” হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে: চানখার পুল ও আশুলিয়া থানা। শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর সারাদেশে অসংখ্য থানায় হাম্লা-লুটপাট করা হয়। তেমনি আশুলিয়া থানায়ও সন্ত্রাসীরা থানায় হামলা চালায়। পুলিশ জীবন ও অস্ত্রাগার রক্ষায় আইনসম্মত আত্মরক্ষামূলক গুলি চালায়, এতে ৬ জন নিহত হয়। শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। (BBC)
আইনি প্রশ্ন:
- Self-defense (আত্মরক্ষা): আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আত্মরক্ষামূলক গুলি অপরাধ নয়।
- ক্ষমতা: তখন প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতাহীন।
- এখানে শেখ হাসিনার “intention” বা “instruction” প্রমাণের প্রয়োজন ছিল — রায়ে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা?
কমান্ড রেসপনসিবিলিটি: সময়সীমাগত অস্পষ্টতা
আন্তর্জাতিক অপরাধে কমান্ড দায়বদ্ধতা প্রযোজ্য তখনই, যখন—
- অপরাধ সংঘটনের সময় ব্যক্তি কমান্ডে থাকবেন
- তিনি অপরাধ রোধ না করার দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন
- অথবা অপরাধ অবশ্যই জানতেন বা জানা উচিত ছিল
এখানে:
- অনেক মৃত্যু ঘটেছে ৫ আগস্টের পর, যখন শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন
- বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে অরাজকতার সময়ে, রাষ্ট্রীয় নির্দেশনার বাইরে
তাই অনেক আইনি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই ক্ষেত্রে আদেশদাতা প্রমাণ করা দুর্বল।
সমগ্র বিচার প্রক্রিয়া: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কোথায় দাঁড়ায়?
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (UN OHCHR) রায় সম্পর্কে বলেছে:
“An important moment for victims, but the death penalty should not have been imposed.”
— Ravina Shamdasani, UN Spokesperson
এর মানে রায়ে কিছু নৃশংস ঘটনার জন্য দায়বদ্ধতা স্থাপন করা হলেও:
- বিচার মান
- আইন প্রয়োগের সময়কাল
- প্রমাণযোগ্যতা
- ন্যায্য প্রক্রিয়া
সবগুলোই পুনরায় পরীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে।
উপসংহার
শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
তবে রায়ের ওপর যেসব আইনগত প্রশ্ন উঠেছে তা অত্যন্ত গুরুতর:
- জাতিসংঘের রিপোর্টকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা
- সংশোধিত আইনকে পূর্ববর্তী সময়ে প্রয়োগ (retroactive justice)
- সংসদবিহীন অবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে তা করা
- আশুলিয়ার আত্মরক্ষামূলক ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা
- আদেশ দেয়ার দায়িত্ব-এর ভুল সময়সীমা নির্ধারণ
- নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা ও তালিকার অসংগতি
এসব কারণেই রায়টি আন্তর্জাতিক আইন, দেশীয় সংবিধান এবং বিচার-মানদণ্ডের আলোকে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকবে কি না — তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক অব্যাহত থাকবে।








Leave a Reply