বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের ছোট্ট জেলা লালমনিরহাট আজ দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূ-কৌশলিক মানচিত্রের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার এক পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি ঘিরে এখন চলছে নীরব কিন্তু গভীর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক হিসাব–নিকাশ।
ভারত, চীন, পাকিস্তান — তিন শক্তিধর রাষ্ট্রের সামরিক ও গোয়েন্দা পরিকল্পনা এই অঞ্চলের দিকে ধীরে ধীরে সরে আসছে এবং বাংলাদেশ নিজেই পরিণত হচ্ছে এক অনিশ্চিত “কৌশলগত পরীক্ষাগার”-এ।
ইতিহাস থেকে বর্তমান: পুরোনো ঘাঁটির পুনর্জন্ম
১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী লালমনিরহাটে বিমানঘাঁটি স্থাপন করেছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) অভিযানে ব্যবহৃত হয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ঘাঁটিটি প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তীতে এর একটি অংশে প্রতিষ্ঠিত হয় Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Aviation and Aerospace University, যা মূলত শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ঘাঁটিটি পুনরায় সক্রিয় করার প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়।
প্রায় ১,১৬৬ একর জমিজুড়ে নতুন ৪ কিমি দীর্ঘ রানওয়ে, আধুনিক হ্যাঙ্গার, এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা তৈরির কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।
বাংলাদেশ সরকার যদিও এটিকে “আঞ্চলিক বেসামরিক ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবহারের জন্য” বলছে, তবু বিদেশি বিশ্লেষকরা এটিকে “দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামো” (dual-use infrastructure) হিসেবে দেখছেন — অর্থাৎ প্রয়োজনে সামরিক বিমান পরিচালনাতেও এটি ব্যবহার করা সম্ভব।
চীনা অংশগ্রহণ ও পাকিস্তানি ছায়া: কলকাতার উদ্বেগ বাড়ছে
২০২৫ সালের মে মাসে চীনা প্রযুক্তি কর্মকর্তাদের একটি প্রতিনিধি দল এই ঘাঁটি পরিদর্শন করে। The Economic Times ও Indian Defence News-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বেইজিং এই প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আর্থিক বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
চীনের অংশগ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের উদ্বেগও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষ করে, পাকিস্তানি সাব–কন্ট্রাক্টরদের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের খবর দিল্লির কৌশলবিদদের আরও সতর্ক করেছে।
খ্যাতনামা বিশ্লেষক ব্রহ্মা চেল্লানি এক মন্তব্যে বলেন,
“লালমনিরহাট প্রকল্প ভারতীয় নিরাপত্তার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কারণ এটি ‘Chicken’s Neck’ করিডোরের ওপর নজরদারির সুযোগ তৈরি করবে।”
‘Chicken’s Neck’ বা Siliguri Corridor হচ্ছে ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখা একমাত্র সরু করিডোর, যার প্রস্থ মাত্র ২২ কিলোমিটার।
লালমনিরহাট এই করিডোর থেকে প্রায় ১৩৫ কিমি দূরে — অর্থাৎ কৌশলগত পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক স্থানে।

ভারতের প্রতিক্রিয়া: উত্তর–পূর্বে পাল্টা ঘাঁটি ও কূটনৈতিক কড়াকড়ি
ভারত এ নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই।
নর্থ–ইস্টের কাইলাশাহার বিমানঘাঁটিকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজ শুরু হয়েছে — The Week-এর তথ্যমতে, এটি সরাসরি লালমনিরহাট অঞ্চলের কার্যক্রম নজরদারির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত হচ্ছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতিমধ্যে জানিয়েছে,
“বাংলাদেশ কখনো এমন কোনো প্রকল্পে জড়াবে না যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।”
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আরও কঠোর ভাষায় বলেন,
“যদি বাংলাদেশ আমাদের ‘Chicken’s Neck’ লক্ষ্য করে, তবে আমরাও তাদের Chicken’s Neck লক্ষ্য করতে প্রস্তুত।”
এদিকে দিল্লি এখন ঢাকা–নয়াদিল্লি সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকেও চাপ তৈরি করছে। সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশি পণ্য পরিবহনের জন্য তাদের বন্দরের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করেছে — যা অনেকেই দেখছেন রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে।
দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূ–কৌশল: সুবিধায় চীন, দ্বিধায় বাংলাদেশ
বিশ্লেষকদের মতে, চীন এই প্রকল্পকে দক্ষিণ এশিয়ায় তার “Belt and Road” প্রভাব বাড়ানোর আরেকটি সুযোগ হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে ঘাঁটি সক্রিয় হলে চীনের জন্য ভারতের সামরিক চলাচল ও যোগাযোগ নেটওয়ার্ক নজরদারি করা সহজ হবে।
এছাড়া, এটি চীনা ড্রোন ও স্যাটেলাইট নজরদারি ব্যবস্থার আঞ্চলিক বর্ধিতাংশ হিসেবেও কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশ সরকার বলছে, এই প্রকল্প সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার অংশ। তবে বাস্তব কূটনৈতিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে,
- চীনের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ছে,
- পাকিস্তানি বেসরকারি ঠিকাদাররা পরোক্ষভাবে প্রবেশ করছে,
- এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে পুরো পরিস্থিতি।
এ অবস্থায় ঢাকা এক জটিল ভারসাম্যের খেলায় আছে —
চীনের বিনিয়োগ, ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং নিজস্ব সার্বভৌম অবস্থান রক্ষা— এই তিনের মাঝখানে সূক্ষ্ম কূটনৈতিক সমন্বয়ই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।
উপসংহার
লালমনিরহাট – বাংলাদেশের প্রকল্প নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মহাজাল
লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি কেবল একটি অবকাঠামোগত পুনর্গঠন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত পুনরাবৃত্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে।
এখানে বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন পর্যবেক্ষিত হচ্ছে তিন দিক থেকে — দিল্লি, বেইজিং ও ইসলামাবাদ।
যদি এই ঘাঁটি কেবল বেসামরিক ব্যবহারে সীমিত না থাকে, তবে এটি হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার পরবর্তী “কৌশলগত এয়ার অনুঘটক” —
যেখান থেকে শুরু হবে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা,
আর সেই প্রতিযোগিতার মঞ্চে লালমনিরহাটই হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ‘চিকেন’স নেক ডিপ্লোমেসি’।
📚 তথ্যসূত্র:
- The Economic Times
- Indian Defence News
- The Week
- East Asia Forum
- Business Today








Leave a Reply