স্বাধীনতা সংগ্রামী অং সান সুচি তাঁর ৮০তম জন্মদিন কাটালেন বিস্মৃত এক কারাগারে
এক দশক আগে, যখন আমি মিয়ানমারে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলাম, তখন অং সান সুচি ছিলেন গণতন্ত্রের প্রতীক—মিয়ানমারের মানুষের আশা ও সংগ্রামের মুখ। কিন্তু আজ, সেই একই নারী তাঁর জীবনের ৮০তম জন্মদিন পালন করেছেন একটি অন্ধকার কারাগারে, প্রায় সকলের স্মৃতি থেকে মুছে গিয়ে।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য যিনি তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন, তিনি এখন পরিত্যক্ত—দেশের ভেতরও, বাইরেও। বিশ্ব যখন নতুন নতুন সংকটে ব্যস্ত, তখন অং সান সুচির নাম আর সংবাদ শিরোনাম হয় না। অথচ তাঁর মতো নেত্রীদের কথা মনে রাখা জরুরি, কারণ তাঁদের সংগ্রামই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কখনও বিনা মূল্যে আসে না, আর ন্যায়ের পথে হাঁটতে হলে প্রায়ই একা হতে হয়।
বিস্মৃত স্বাধীনতার প্রতীক অং সান সুচি
অং সান সুচির ৮০তম জন্মদিনের এই সংবাদটি শুধু একজন নেত্রীর ব্যক্তিগত বেদনাবহ অধ্যায় নয়, বরং মিয়ানমারের গণতন্ত্রের মৃতপ্রায় অবস্থার প্রতীকও বটে। একসময় যাঁর নাম উচ্চারণ হতো নোবেল শান্তি পুরস্কার, অহিংস আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক আশার সমার্থক হিসেবে, আজ সেই সুচি নীরবে দিন কাটাচ্ছেন সামরিক জান্তার কারাগারে।
২০১০–২০১৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সুচির নেতৃত্বে মিয়ানমার যে সামান্য গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিল, তা সামরিক বাহিনীর পুনরুত্থানে এক মুহূর্তে ভেঙে যায়। ২০২১ সালের অভ্যুত্থান কেবল সুচিকেই বন্দি করেনি, বরং দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভিত্তিটাকেও ধ্বংস করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়াও আজ অনেক নিস্তেজ। এক সময় যেভাবে পশ্চিমা বিশ্ব তাঁর মুক্তির দাবিতে সরব ছিল, আজ তারা ইউক্রেন, গাজা, তাইওয়ানসহ নানা বৈশ্বিক সংকটে ব্যস্ত। সুচির বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে যে সমালোচনা উঠেছিল, তা হয়তো তাঁর প্রতি বিশ্বসমাজের সহানুভূতি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে; কিন্তু এই ঘটনাই প্রমাণ করে—রাজনীতি কখনও কালো বা সাদা নয়, বরং নৈতিকতার ধূসর ছায়ায় ঢাকা।
অং সান সুচি নিখুঁত নন, কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কারাবাস, দৃঢ়তা ও ব্যক্তিগত ত্যাগ মানব ইতিহাসে এক বিরল উদাহরণ। মিয়ানমারের মানুষ আজও এক এমন ভবিষ্যতের অপেক্ষায় যেখানে বন্দুক নয়, ভোটের মাধ্যমে দেশ পরিচালিত হবে। আর সুচি—এই আশার নীরব প্রতীক হয়ে—অন্ধকার কারাগারেও স্বাধীনতার আলো জ্বালিয়ে রাখছেন।








Leave a Reply