মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক বিমান হামলা ও ড্রোন আক্রমণ চালিয়ে বেদখল হওয়া এলাকা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা জোরদার করেছে। স্থলযুদ্ধে বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর তারা আকাশপথে আক্রমণের ওপর নির্ভর করছে, আর সেই প্রক্রিয়ায় চীনের নীরব কিন্তু বাস্তব সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
আকাশ হামলায় তীব্রতা
তৎমাড নামে পরিচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালাচ্ছে। এতে বহু গ্রাম, স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে এবং শত শত সাধারণ মানুষ নিহত বা আহত হয়েছেন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থলবাহিনী যখন প্রতিরোধে আটকে পড়ছে, তখন আকাশ থেকে চালানো হামলাগুলো বিদ্রোহী বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করছে।
চীনের ভূমিকা
চীন প্রকাশ্যে “শান্তির পক্ষে” অবস্থান নিলেও, বাস্তবে তারা মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
- বেইজিংয়ের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো মিয়ানমারকে ড্রোন প্রযুক্তি, বিমান যন্ত্রাংশ ও নজরদারি সরঞ্জাম সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
- চীনা কোম্পানিগুলোর অর্থায়নে তৎমাডের জ্বালানি ও অস্ত্র সরবরাহের শৃঙ্খল সচল রয়েছে।
- পাশাপাশি, চীন মিয়ানমারের উত্তরে সংঘর্ষে “মধ্যস্থতার” নামে সেনাদের কূটনৈতিক সুবিধা দিচ্ছে।
কূটনৈতিক মহল বলছে, চীন মিয়ানমারকে পুরোপুরি হারাতে চায় না, কারণ দেশটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প, পাইপলাইন এবং বঙ্গোপসাগরমুখী বন্দরগুলোর জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
এই অভিযানে বেসামরিক জনগণের জীবন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- বিমান হামলায় স্কুল, হাসপাতাল ও ধর্মীয় স্থানে আঘাতের খবর পাওয়া গেছে।
- হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে পার্বত্য এলাকা বা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিচ্ছে।
- জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এসব হামলায় যুদ্ধাপরাধের সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া
ভারত, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলো ক্রমবর্ধমান শরণার্থী স্রোত ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
ASEAN দেশগুলো মানবাধিকার ইস্যুতে মৃদু প্রতিক্রিয়া জানালেও, বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না।
অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও চীন ও রাশিয়ার সমর্থনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এখনো টিকে আছে।
বিশ্লেষণ: যুদ্ধের ছায়ায় কূটনীতি
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের এই সহায়তা কেবল সামরিক নয়—এটি একধরনের কূটনৈতিক বার্তা, যা বলে দেয় বেইজিং তার দক্ষিণ সীমান্তে নিজের প্রভাব হারাতে দেবে না।
তবে এই সহায়তা যতই বাড়ুক, স্থায়ীভাবে এলাকা দখলে রাখা মিয়ানমারের জন্য এখনো কঠিন।
কারণ আকাশ থেকে দমন করা গেলেও, স্থলপথে জনগণের প্রতিরোধ ও বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর শক্তি সহজে কমছে না।
আরাকান আর্মি কি করবে?
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সক্রিয় আরাকান আর্মি (AA) বর্তমানে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার মুখে অবস্থান পুনর্গঠন করছে। সংগঠনটি এখন সরাসরি মুখোমুখি লড়াই না করে সীমান্ত অঞ্চলে গেরিলা কৌশল, রসদ সরবরাহ ও জনসমর্থন বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের প্রকাশ্য অবস্থান ও সেনাবাহিনীর আকাশসীমা দখলের পরও আরাকান আর্মি শিগগিরই নতুন কৌশল নিয়ে ফিরে আসতে পারে—কারণ তাদের লক্ষ্য শুধু অঞ্চল রক্ষা নয়, বরং রাখাইনকে আধা–স্বাধীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পৌঁছে দেওয়া।
উপসংহার
মিয়ানমারে এখন একদিকে সেনাবাহিনীর বিমান হামলা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাঁচার লড়াই। চীনের সহায়তায় জান্তা কিছু এলাকা পুনরুদ্ধার করতে পারলেও, এর বিনিময়ে দেশটি ক্রমে পরিণত হচ্ছে একটি নির্ভরশীল সামরিক রাষ্ট্রে, যার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন আরও অনিশ্চিত। বাংলাদেশ এখনই সতর্ক অবস্থান না নিলে ভবিষ্যতে মিয়ানমারের অবস্থা হতে পারে বলে বিশ্লেষক মহল আশংকা করছেন।
সূত্রঃ BBC








Leave a Reply