সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক নড়াচড়া বিশেষভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, যার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন ঘটছে মধ্যপ্রাচ্যে। একদিকে গাজার সংঘাতকে কেন্দ্র করে শান্তির ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে মনে হচ্ছে এ সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমন্বিতভাবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করার পথে এগোচ্ছে।
ইরানও প্রস্তুতি নিচ্ছে। চীন থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, রাশিয়া থেকে যুদ্ধবিমান ও সামরিক কার্গো আসছে বলে জানা গেছে। ফলে এক বড় আঞ্চলিক যুদ্ধের সম্ভাবনা দিন দিন প্রবল হয়ে উঠছে।
হঠাৎ বৈঠক ও কৌশল পুনর্গঠন
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভার্জিনিয়ার কোয়ান্টিকো ঘাঁটিতে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক নেতৃত্বের জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। সেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপস্থিতি এটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। সাধারণত এ ধরনের বৈঠক কেবল সামরিক মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ট্রাম্পের সরাসরি অংশগ্রহণ বোঝায়, এটি শুধু সামরিক নয় বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্তরে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রস্তুতি।
ড্রোন ও মিসাইল প্রতিরক্ষার অগ্রাধিকার
মার্কিন বাহিনী স্পষ্টভাবে ইরান ও ইরান-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা জোরদার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশযুদ্ধ এখন আর শুধু ফাইটার জেটের লড়াই নয়, বরং হাজার হাজার ড্রোনের “সংখ্যার খেলা।” যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল তাই প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ—দুই দিকেই নতুন ভারসাম্য খুঁজছে।
গোয়েন্দা ঘাটতি ও ইসরায়েলি আগ্রাসন
দোহায় ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার আগাম খবর মার্কিন গোয়েন্দারা ধরতে পারেনি। এটি একদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দেখিয়েছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের স্বাধীন সামরিক আচরণকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইরানের দিকে নজর রাখলেও, আঞ্চলিক মিত্রদের অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপে তারা প্রায়শই অন্ধকারে থেকে যায়।
ঘাঁটির পুনর্বিন্যাস ও বাহিনী বৃদ্ধি
২০২৪ সালে যেখানে মার্কিন সৈন্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৪,০০০, এখন তা বেড়ে ৫০,০০০ ছাড়িয়েছে। যুদ্ধজাহাজ, এয়ার ট্যাঙ্কার, এফ-১৬, এফ-২২, এফ-৩৫, এফ-১৫ই থেকে শুরু করে এ-১০ থান্ডারবোল্ট পর্যন্ত বিপুল সামরিক শক্তি জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনে ছড়িয়ে রাখা হচ্ছে।
একইসঙ্গে ইরাকের ঝুঁকিপূর্ণ ঘাঁটি থেকে সৈন্য সরিয়ে নিরাপদ অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে—এটি একপ্রকার “অস্থায়ী পুনর্বিন্যাস,” যা বোঝাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি পিছিয়ে আসছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল উপস্থিতি বজায় রাখার জন্য নতুনভাবে অবস্থান নিচ্ছে।
আঞ্চলিক সমন্বয় ও জোটবদ্ধতা
নতুন সেন্টকম কমান্ডারের ইসরায়েল সফর, হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা, সৌদি আরব–পাকিস্তান–মিশরকে নিয়ে যৌথ সামরিক মহড়া—সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র শুধু এককভাবে নয়, আঞ্চলিক দেশগুলোকে সঙ্গী করেই ইরানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিরোধ জোট গঠন করতে চাইছে। পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তি বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যা ইঙ্গিত করে এ কৌশল দক্ষিণ এশিয়াতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সম্ভাব্য পরিণতি
সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি যেন এক অদৃশ্য কাউন্টডাউন-এর দিকে এগোচ্ছে।
- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্দেশ্য: ইরানের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব সীমিত করা।
- ইরানের প্রতিক্রিয়া: চীন-রাশিয়ার সহায়তায় সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো।
- আঞ্চলিক বাস্তবতা: সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে ইরানের হুমকি নিয়ে শঙ্কিত, অন্যদিকে মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির উপর নির্ভরশীল।
- বড় ঝুঁকি: গাজা বা লেবাননকে কেন্দ্র করে সীমিত সংঘাত দ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
সারকথা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক নড়াচড়া কেবল প্রতিরক্ষামূলক নয়, বরং সম্ভাব্য আক্রমণাত্মক কৌশলের অংশ। ইরানও পাল্টা প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। ফলে মধ্যপ্রাচ্য আবারও “বড় যুদ্ধের প্রান্তে” দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ মিলেমিশে এক জটিল সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।








Leave a Reply