![]() |
| ছবিঃ সংগৃহীত |
বাংলাদেশে স্ট্রোক এখন ঘরে ঘরে পরিচিত এক ভয়ংকর রোগের নাম। বাবা-মা হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন, দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তার জানালেন—স্ট্রোক হয়েছে। শরীর প্যারালাইজড, কথা জড়ানো, খাওয়াদাওয়া নাকের নলে। অসহায় এই পরিস্থিতিতে স্বজনরা ডাক্তারকে একটাই প্রশ্ন করেন—“আমার রোগী কি সুস্থ হবে?”
ডাক্তারদের উত্তর শীতল আর নির্মম:
“স্ট্রোক ভালো করার কোনো সরাসরি চিকিৎসা নেই।”
হ্যাঁ, বাস্তবতাটা কঠিন। শরীর নিজস্ব প্রক্রিয়ায় কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠে, বাকি কাজ ফিজিওথেরাপি। তাও দীর্ঘমেয়াদি ধৈর্য ও সামর্থ্যের ব্যাপার।
তবে পুরোপুরি চিকিৎসাহীনও নয়। নতুন শতাব্দীতে এসেছে এক জীবনদায়ী ঔষধ—Alteplase। সঠিক সময়ে ব্যবহার করতে পারলে এই ঔষধ অনেক রোগীকে প্রায় পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারে। কিন্তু দাম?
৫০ মিগ্রা ইনজেকশনের দাম প্রায় ৫০ হাজার টাকা। একজন রোগীর জন্য প্রয়োজন হতে পারে দুই ভায়াল, অর্থাৎ এক লাখ টাকা। এটাই সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে, গরিবের তো কল্পনারও বাইরে।
তখনই সামনে আসেন এক তরুণ ডাক্তার
রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসক ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ান অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। নেদারল্যান্ডস থেকে এনেছেন ১৭ কোটি টাকার Alteplase, যা এখন রাজশাহী অঞ্চলের গরিব মানুষের আশার আলো।
শ্রেয়ানের এই সাফল্য একদিনে আসেনি। তিনি যোগাযোগ করেছেন World Stroke Organization, Direct Relief এবং Angels Initiative–এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে। সঠিক পরিকল্পনা, দৃঢ় মানসিকতা আর অবিশ্বাস্য ধৈর্যের মাধ্যমে তিনি এই ঔষধগুলো দেশের মানুষের জন্য এনে দিয়েছেন।
মাত্র ২৩–২৪ বছরের এক তরুণ চিকিৎসক, যিনি বিসিএসের পড়া বা রাজনীতির ডামাডোলের বাইরে দাঁড়িয়ে দেশের গরিব মানুষের জন্য লড়ছেন—এটা কেবলই অস্বাভাবিক নয়, বিস্ময়করও বটে।
কিন্তু নীরব রয়ে গেছে মিডিয়া
এমন অভাবনীয় উদ্যোগের খবর দুই দিনেও মূলধারার কোনো নিউজ মিডিয়ায় স্থান পায়নি। কেবল ডাক্তারদের কিছু ফেসবুক পেজেই ঘুরে বেড়াচ্ছে কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা। অথচ এদেশে অনেক তুচ্ছ খবরও মিডিয়ায় প্রধান হয়ে ওঠে—কোনো ছাত্রনেতার সিগারেট ধরানো, ক্যান্টিনে খাওয়ার ছবি, বা রাজনৈতিক বকৃতা।
মিডিয়ার অবশ্য দায়ও পুরোপুরি নেই। নিউজ মানেই ব্যবসা; দর্শকের আগ্রহ যেখানে, ক্যামেরা যায় সেখানেই। মানুষের যদি জীবনরক্ষাকারী ওষুধে আগ্রহ থাকতো, ক্যামেরা ঠিকই খুঁজে নিতো শ্রেয়ানকে।
ভাগ্যিস, বিখ্যাত হয়নি
এখানেই এক অদ্ভূত সত্য। হয়তো ভাগ্যিস মিডিয়া এখনও তাকে আলোচনায় তোলেনি। কারণ বাংলাদেশে একবার ক্যামেরার নজরে এলে মানুষ হয় “নায়ক”, নতুবা “খলনায়ক”। সামান্য ভুল বোঝাবুঝি বা অপছন্দের কোনো মন্তব্যই নায়ককে মুহূর্তে ভিলেনে পরিণত করতে পারে।
ডাঃ শ্রেয়ান সেই ফাঁদে পড়েননি। তিনি নীরবে কাজ করেছেন, ক্রেডিট পাওয়ার লোভ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ থেকেই তার এই উদ্যোগ।
এখন দরকার সুষ্ঠ বিতরণ
সবচেয়ে জরুরি বিষয়—এই ঔষধগুলো যেন গরিব মানুষের কাছে পৌঁছে। ধনীদের সর্বগ্রাসী প্রভাব যেন এগুলোকে গ্রাস না করে। প্রশাসন ও স্বাস্থ্যখাতকে এখন দায়িত্ব নিতে হবে এই ওষুধের সঠিক ব্যবহারে।
শ্রদ্ধা ও শুভকামনা
ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ান প্রমাণ করেছেন—অল্প বয়স, সীমিত ক্ষমতা আর একগুঁয়ে দৃঢ়তা দিয়েও পরিবর্তন আনা যায়। যে দেশে রাতারাতি এক হাজার কোটি টাকার বিদ্যুতের তার চুরি হয়, যে দেশে ছাত্রনেতাদের সম্পদ হাজার কোটির স্কেলে গুনতে হয়—সেই দেশে ১৭ কোটি টাকার জীবনদায়ী ঔষধ নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে এক মিরাকল।
হয়তো রাষ্ট্র বা মিডিয়া এখনই তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তাতে কিছু আসে যায় না। কারণ এখনও এই দেশে কিছু মানুষ আছে, যারা ভালো মানুষকে ভালোবাসে, সম্মান করে। তাদের সেই ভালোবাসার আলোয় ডাঃ শ্রেয়ান এগিয়ে যাবে।
অভিনন্দন, ডাঃ শীর্ষ শ্রেয়ান। তোমার প্রচেষ্টা আমাদের আশাবাদী করে।
#স্ট্রোক-চিকিৎসা-বাংলাদেশ, #Alteplase-ওষুধ, ডাঃ-শীর্ষ-শ্রেয়ান, #রাজশাহী-মেডিকেল-কলেজ, #বাংলাদেশে









Leave a Reply