পৃথিবীতে হাজার হাজার ধর্ম, মতবাদ ও বিশ্বাস ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, কেউ খ্রিস্টান, কেউ বৌদ্ধ, আবার কেউ আদিবাসী বা লোকধর্মে বিশ্বাসী। একই ধর্মে আছে আবার বিভিন্ন ধারা। কিন্তু একটি প্রশ্ন বহুদিন ধরেই মানুষের মনে ঘুরপাক খায়—আল্লাহ কি শুধু একটি জাতির জন্য নবী পাঠিয়েছেন, নাকি পৃথিবীর প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝেই কোনো না কোনো সতর্ককারী পাঠিছিলেন?
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন—
“আমি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছি সু-সংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে।”
— সূরা ফাতির (৩৫:২৪)
আয়াতের পরের অংশে বলা হয়েছে—
“এমন কোনো সম্প্রদায় নেই, যাদের মাঝে সতর্ককারী আসেনি।”
— সূরা ফাতির (৩৫:২৪)
এই আয়াতটি খুব গভীর চিন্তার দরজা খুলে দেয়। কারণ, যদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝেই সতর্ককারী এসে থাকেন, তাহলে পৃথিবীর বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির পেছনেও কোনো না কোনো ঐশী নির্দেশনার ছাপ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
ইসলামি সমাজে প্রচলিত আছে যে পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-পয়গম্বর এসেছিলেন। কোথাও বলা হয় ১ লক্ষ ২৪ হাজার, কোথাও ২ লক্ষ ২৪ হাজার। যদিও এই সংখ্যা কোরআনে সরাসরি উল্লেখ নেই, তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট—কোরআনে মাত্র ২৫ জন নবীর নাম এসেছে। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক নবীর পরিচয় মানুষের কাছে অজানা রয়ে গেছে।
তাহলে প্রশ্ন আসে—বাকি নবীরা ছিলেন কারা? তারা কোথায় এসেছিলেন? কোন জাতি বা সভ্যতার কাছে এসেছিলেন?
পূর্ববর্তী নবীগণের ইতিহাস থেকে জানা যায়, নবীদের একাধিক স্ত্রী ছিলো এবং তাদের মধ্যে হিংসা, রেষারেষি ছিলো। তাদের ছেলে সন্তানরা একেকজন ধর্মের একেক রকম ধারা চালু করেছেন, যারমধ্যে অনেকের নামই অপ্রকাশ্য রয়ে গেছে।
এদের কেউ কেউ হয়তো আফ্রিকার কোনো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর মাঝেও একজন সতর্ককারী এসেছিলেন। হয়তো আমেরিকার আদিবাসীদের মাঝেও কেউ সত্য ও ন্যায়ের বাণী নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। হয়তো ভারতীয় উপমহাদেশ, চীন, মায়া, ইনকা বা অন্য সভ্যতাগুলোর মধ্যেও আল্লাহর পাঠানো মানুষ ছিলেন, যাদের নাম আজ ইতিহাসে নেই এবং স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছে অজানা।
এটি কেবল কল্পনা নয়; বরং কোরআনের বক্তব্য থেকেই এমন চিন্তার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
সব ধর্মেই যদি কোনো না কোনো সতর্ককারীর প্রভাব থাকে, তাহলে কি সব ধর্মই সমান সত্য?
কোরআনের দৃষ্টিতে বিষয়টি একটু ভিন্ন। ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ বা শান্তি হলেও কোরআনে “ইসলাম” বলতে বোঝানো হয়েছে আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের পথ। সেই অর্থে কোআরনে উল্লেহিত নবীগন যেমন; আদম, নূহ, ইব্রাহিম, মুসা, ঈসা—সব নবীই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। অর্থাৎ মূল শিক্ষা ছিল এক আল্লাহ, ন্যায়, মানবতা ও সত্যের শিক্ষা।
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মানুষের হাতেই অনেক শিক্ষা পরিবর্তিত হয়েছে। কোথাও যুক্ত হয়েছে কুসংস্কার, কোথাও ক্ষমতার রাজনীতি, কোথাও মানুষের তৈরি নিয়ম। ফলে আজকের সব ধর্মকে একেবারে একই বলা কঠিন।
তবে এটাও সত্য যে পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মেই কিছু মৌলিক নৈতিক শিক্ষা আছে—মানবতা, দয়া, সত্যবাদিতা, অন্যায়ের বিরোধিতা, শান্তি ইত্যাদি। এগুলো হয়তো সেই প্রাচীন সতর্ককারীদের শিক্ষারই কিছু অবশিষ্ট অংশ।
সবকিছু একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।
তবে সমস্যা হয় তখন, যখন মানুষ নিজের ধর্মকে সত্য প্রমাণ করতে গিয়ে অন্য সব মানুষকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বা অভিশপ্ত ভাবতে শুরু করে। অথচ কোরআন মানুষকে চিন্তা করতে, পর্যবেক্ষণ করতে এবং জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানায়।
আল্লাহ যদি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের মাঝেই সতর্ককারী পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে পৃথিবীর মানুষের ইতিহাস ও বিশ্বাসকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করা ঠিক নয়, কারণ আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের জ্ঞান সীমিতি। তাই আমাদের উচিত সত্য, নৈতিকতা ও মানবতার মিলগুলো খুঁজে দেখা।
এর অর্থ এই নয় যে সব ধর্ম হুবহু একই বা সব বিশ্বাস সমানভাবে সঠিক। বরং এর অর্থ হতে পারে—মানবজাতির ইতিহাসে আল্লাহর নির্দেশনা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ভাষায় এবং বিভিন্ন সংস্কৃতির মাধ্যমে এসেছে।
শেষ পর্যন্ত মানুষের আসল পরীক্ষা সম্ভবত নাম বা পরিচয়ে নয় – বরং সত্য, ন্যায়, মানবতা ও সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থার মধ্যে, সেটা যে নামেই ডাকা হোক।
ধর্ম নিয়ে অন্ধ ঘৃণার বদলে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা এবং পারস্পরিক সম্মানই আজকের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ “হুকুম দেয়ার অধিকার শুধু আল্লাহরই” – সূরা ইউসুফের ৪০ নম্বর আয়াতের বিশ্লেষণ







Leave a Reply