পরেরদিন আজমীর থেকে বাসযোগে রাজস্থানের রাজধানী জয়পুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার প্ল্যান। কিন্তু অনলাইনে তেমন ভালো বাসের সন্ধান পাচ্ছিলাম না। শুধু রাজস্থানের সরকারি বাস কোম্পানির (RSRTC) সিডিউল পাই। তাই অনলাইনে টিকেট না কিনে সকালে সরাসরি বাস ডিপোতে যাই। ১৩০-১৩৫ কিলোমিটার রাস্তা, সরকারি বাসের ভাড়া মাত্র ১২০ রুপি। কিন্তু নন-এসি। গরমের দিন, তাই ভাবছিলাম। হঠাৎ নজরে এলো অদূরে একটি সুন্দর বাস দাঁড়িয়ে আছে। এগিয়ে গেলাম। উত্তর প্রদেশ সরকারের একটি মধ্যম মানের বিলাসবহুল এসি বাস, ভাড়া ৩০০ রুপি। তাড়াতাড়ি টিকেট নিয়ে উঠে পড়লাম। জার্নিটা বেশ আনন্দদায়ক এবং আরামদায়ক ছিল। সময় লেগেছিল মাত্র ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট।
পূর্ববর্তী পর্বঃ গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৩৮)
জয়পুর
জয়পুর রাজস্থানের রাজধানী। জয়পুরকে বলা হয় পিঙ্ক সিটি। সত্যিই শহরের অনেক স্থাপনা, বিশেষ করে পুরোনো অংশ, গোলাপি রঙের প্রলেপে ঢাকা। শহরের কেন্দ্রে রাজা মানিসিংহের সুশোভিত মুর্যাল। শহরে পৌঁছে এসব দেখতে দেখতে প্রথমেই যাই হাওয়া মহল দেখতে। অদ্ভুত স্থাপত্যশৈলী, ছোট ছোট অসংখ্য জানালা—যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হলো যেন মুঘল ইতিহাস আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। দুয়েকদিনে দেখে শেষ করা যায় না। হাওয়া মহলের অদূরে পর্যটকদের দেখার অনেক কিছুই আছে। সেখানে পর্যটকদের সাহায্যের জন্য আছে বিভিন্নজন। সফরসঙ্গী ছেলে ও ছেলের বৌ একজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়ে জয়পুরের পোশাকে ছবি তুললো।
আরও আছে বিশাল লেকের মাঝখানে এক ভবন, নাম জল মহল। দূর থেকে মনে হয় পানির উপর দাঁড়িয়ে আছে এক বিরাট ভবন।

জয়পুর শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় ভরপুর। তবে কোনো বিশৃংখলা নাই। নির্ধারিত রুটের বাইরে কেউ যায় না। সবাই সউদ্যোগে নিয়ম মেনে চলে, ট্রাফিক দিয়ে কন্ট্রোল করাতে হয় না।
আম্বের দূর্গ
পরের দিন যাই আম্বের ফোর্টে। পাহাড়ের গায়ে বিশাল দুর্গ, ভেতরে প্রবেশ করতেই শাসক শ্রেণির সমৃদ্ধি, রাজকীয় বৈভব যেন ভেসে ওঠে। রাজস্থানের রোদ প্রচণ্ড, কিন্তু প্রাচীন স্থাপত্যের বিশালতা তার চেয়েও বড় বিস্ময় তৈরি করলো।
রাজা মানসিংহ সেনাপতি হিসেবেই বেশি পরিচিত। বাংলার বারভুঁইয়া ইশা খাঁর বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন। আম্বের দূর্গের ভিতরে না দেখলে বোঝার উপায় নাই তৎকালিন রাজারা কতটা সুরক্ষিত থাকতেন। বিশাল জায়গা নিয়ে গঠিত দূর্গের ভিতরে ঢুকলে হারিয়ে যাবেনই। সাথের কে কোন কুঠিতে ঢুকে পড়েছে, খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কোনদিক দিয়ে বেরুতে হবে তাও ভুলে যাবেন। দূর্গের ভিতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় ন, ফলে আরো মুশকিলে পড়তে হয়।
পরিবেশ
রাজস্থান মুসলিমপ্রধান রাজ্য, অথচ কিছু কিছু হিন্দুপ্রধান রাজ্য বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি রক্ষণশীল। জয়পুর শহরে নিরামিষভোজী রেস্তোঁরা বেশি। প্রতি রেস্তোঁরাতে খাবারের সাথে পনির খাওয়ার প্রচল। কলকাতার খাওয়া-দাওয়া আমাদের সাথে মিল আছে, কিন্তু পশ্চিমে একটু সমস্যা হয়েছে। কোনোকিছুই খেতে রুচি হচ্ছিলো না।
রাতে রেস্তোঁরা খুজতে খুজতে যেটা পছন্দ হলো আঙ্গিনায় গিয়ে বসলাম। একজন শিখ ধর্মীয় লোক এগিয়ে এলো। জিজ্ঞেস করলাম, জয়পুর শহরে গরুর মাংস পাওয়া যায় কোন রেস্তোঁরায়? বেচারা কানে হাত এবং জিহবায় কামড় খেলো। বললো, এই শহরে এটা প্রচলিত নয়।
দিনে যে ট্যাক্সিতে ঘুরেছিলাম সে গাড়ির ড্রাইভার ছিলো মুসলিম। তার সাথেও আলাপচারিতায় জেনেছিলাম, তারা সহজে গরুর মাংস খেতে পারে না। কারন হিসেবে যেটা জানা গেলো, রাজস্থান রাজ্যে ব্যক্তি পর্যায়ে গরু পালন করার নিয়ম নাই। সব গরু রাজ্য সরকারের মালিকানাধীন। দেখলামও তাই। আজমীর থেকে বাসে আসার সময় সারা মাঠে যত্রতত্র ছেড়ে দেয়স গরু চড়তে দেখেছি। জয়পুর শহরেও তাই। সারা শহরে ছেড়ে দেয়া গরু চড়ে বেড়াচ্ছে।
আগ্রার উদ্দেশ্যে জয়পুর ত্যাগ
অগত্যা সেই রেটুরেন্টেই রাতের খাবার সম্পন্ন করলাম। পরের দিনের প্রোগ্রাম আগ্রা। আগেই জেনেছিলাম, জয়পুর থেকে নাইট কোচ ছেড়ে যায় আগ্রার উদ্দেশ্যে। বিদেশে রাতের জার্নি লাভজনকও বটে – একদিনের হোটেলভাড়া বেঁচে যায়। তাই হোটেল ছেড়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলাম আগেই। রাতের আহার শেষে বাস টার্মিনালে গেলাম টিকেট করতে।
এই প্রথম বাসে দুই রকমের আসন দেখলাম – বসার ও শোয়ার। আমাদের দেশে তখনো চালু হয়েছিলো কিনা জানা নেই, কারণ অনেকদিন দূরপাল্লার বাসে কোথায়ও যাতায়াতের প্রয়োজন পড়েনি।
যাইহোক, বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখলাম আমাদের সুবিধামত বাসে মাত্র দুটি বসার সিট আছে, বাকি সব শোয়ার সিট। অগত্যা তাই নিলাম, দুটি বসার এবং দুটি শোয়ার। শোয়ার মানে একেবারে সটান শোয়ার, হাফ শোয়ার না। আমাদের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ রুটে যেমন বসার সিটের উপরে দুটি শোয়ার সিট, সেটা তা ছিলো না। একটি করে সিট।
স্থানীয় সময় রাত একটায় বাস ছাড়বে, আগ্রায় পৌছাবে সকাল ৭ টায়। টিকেট নিয়ে হোটেলে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে সবাইকে নিয়ে বাস টার্মিনালে চলে এলাম। (চলবে……)
পরবর্তী পর্বঃ গরীবের ভ্রমণ বিলাস (পর্ব-৪০)


I love how you shared the details of your bus journey from Ajmer to Jaipur. It’s so relatable how travel can sometimes be about discovering unexpected comfort, like the air-conditioned bus you found at the last minute! Jaipur’s Hawa Mahal sounds mesmerizing—I can almost picture the architecture with all those tiny windows.
I respect your feelings. Thanks for your comment.