মৃত লাশ গেল জীবন্ত লাশ দেখতেঃ আইনের অনৈতিক বাতাবরণে বন্দি মানবিকতা

বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে বাগেরহাটের একটি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম গত নয় মাস ধরে কারাগারে। পরিবার, স্থানীয় নেতাকর্মী ও আইনজীবীদের দাবি—তার অপরাধ একটাই, তিনি আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত রায় হয়নি, মামলা বিচারাধীন। কিন্তু এই বিচারাধীন অবস্থাতেই তার জীবনে নেমে এসেছে এমন […]

বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের ঘটনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা প্রশ্নের মুখে

বাগেরহাটের একটি উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম গত নয় মাস ধরে কারাগারে। পরিবার, স্থানীয় নেতাকর্মী ও আইনজীবীদের দাবি—তার অপরাধ একটাই, তিনি আওয়ামী লীগ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এখনো পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত রায় হয়নি, মামলা বিচারাধীন।

কিন্তু এই বিচারাধীন অবস্থাতেই তার জীবনে নেমে এসেছে এমন এক মানবিক বিপর্যয়, যা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় কল্পনা করাও কঠিন।

সন্তানের জন্ম, বাবার অধিকার বাতিল

কারাবন্দি অবস্থায় সাদ্দামের স্ত্রী একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। আইনজীবীদের মাধ্যমে আদালতে আবেদন করা হয়—অন্তত একবার নবজাতক সন্তানকে কোলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।

এই আবেদন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নামঞ্জুর করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
কারা বিধি অনুযায়ী বিশেষ মানবিক পরিস্থিতিতে সীমিত সাক্ষাতের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও, এই ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হয়নি।

প্রশ্ন উঠছে—
এই নিষ্ঠুরতা কি আইনের বাধ্যবাধকতা, নাকি প্রশাসনিক অনীহা?

হতাশার দায় কার?

পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে দেখা না হওয়া, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা এবং একের পর এক আবেদন প্রত্যাখ্যান—সব মিলিয়ে চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ওরফে স্বর্ণালি (২২)। অবশেষে বেছে নেন আত্মহননের পথ। খবর অনুযায়ী ৯ মাস বয়সী শিশুসন্তান সেজাদ হাসান (নাজিফ)-কে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেন স্বর্ণালি। সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেনঃ

ভাবি শুধু বলতো, “আপনার ভাই কি ছাড়া পাবে না?”

বিভিন্নজন বিভিন্ন সময় তাকে বলেছে, সে কখনোই ছাড়া পাবে না। ছাড়া পেলেও স্বামী যে ভাইরাল হইছে, তাকে মেরে ফেলবে। এগুলো নিয়ে সে খুব হতাশ ছিল।’

পরবর্তীতে ঘটে যায় এই ভয়াবহ পারিবারিক বিপর্যয়- যা কোনো সভ্য রাষ্ট্রেই গভীর আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। কিন্তু রাষ্ট্র কি সেই আত্মসমালোচনা বোঝে?

মৃত স্ত্রী ও সন্তানের মুখ দেখার অধিকারও নেই

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এখানেই। স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর পরও সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি।

পরিবারের দাবি, লাশ দেখার জন্য একাধিকবার আবেদন করা হয়। সব আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়।

অবশেষে অনুমতি দেয়া হয় লাশ কারাগারের ফটকে আনার, যা পৃথিবীর ইতিহাসে আছে কিনা জানা নেই। কারাগারের ফটকে মৃতদেহ আনা হলে সেখানেও ৫ মিনিটের বেশি থাকার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এটি কি কারা বিধির নির্দেশ, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার—সে প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা।

কারা কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত ও লিখিত ব্যাখ্যা জনসম্মুখে আসেনি।

একই সময়ে দুই বিচার—দুটি আইন?

এই ঘটনার সময়েই আরেকটি ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
প্রকাশিত তথ্যমতে, একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী ওইদিন আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন পান।

এখানে প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক নয়, মৌলিক ন্যায়বিচারের। বিচারাধীন একজন রাজনৈতিক কর্মী শেষবারের মতো মৃত স্ত্রী ও সন্তানকে দেখার সুযোগ পান না। অথচ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী জামিন পান। তাহলে আইনের ভারসাম্য কোথায়?

কারা ব্যবস্থার দ্বিচারিতা কি প্রাতিষ্ঠানিক?

এই লেখকের পূর্ব অভভিজ্ঞতা আছে, তিনি নিজেই স্বচক্ষে এমন নজির দেখেছেন, যেখানে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে অন্য একটি মামলায় হাজিরা দিতে এনে আদালতের পেশকারের রুমে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়েছে।

সাক্ষাতের সময় কারা বিধির শিথিল প্রয়োগও দেখা গেছে। সাজাপ্রাপ্ত আসামী তার স্ত্রীর মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য স্বজন অথবা পরিচিত কারো সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা বলছেন। রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে কোর্ট পুলিশ।

এভাবেই হয়তো কারাগারে বসে অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসীরা।

এই বাস্তবতার পাশে দাঁড় করালে সাদ্দামের ক্ষেত্রে নেওয়া সিদ্ধান্তকে “ব্যতিক্রম” বলা কঠিন—বরং এটি নির্বাচিত নিষ্ঠুরতা বলেই মনে করছেন অনেকেই।

রাষ্ট্র কি কেবল শাস্তি দিতে জানে?

বিশ্লেষকদের মতে, আইনের উদ্দেশ্য শাস্তি নিশ্চিত করা—মানবিকতা মুছে ফেলা নয়। সংবিধান যেখানে নাগরিকের মানবিক মর্যাদার কথা বলে, সেখানে একজন বিচারাধীন বন্দিকে এমন আচরণের মুখে ফেলা রাষ্ট্রের নৈতিক দায় এড়াতে পারে না।

উপসংহার: একটি পরিবারের মৃত্যু, রাষ্ট্রের নীরবতা

বাগেরহাটের সাদ্দামের ঘটনা এখন আর ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি হয়ে উঠেছে সার্বজনীন। প্রশ্ন উঠেছে কারা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, বিচার ব্যবস্থার সমতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানবিক অধিকার প্রয়োগের বাস্তব চিত্র।

এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত, কারা কর্তৃপক্ষের লিখিত ব্যাখ্যা এবং বিচারিক পর্যালোচনা ছাড়া রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—
এই দেশে আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং সবার জন্য সমান কিনা, নাকি বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কারও জন্য হয়ে যায় আরও কঠোর?

আরও পড়ুনঃ

১। একসময় নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী দলটির সঙ্গে ‘বন্ধুত্ব’ চাইছে যুক্তরাষ্ট্রঃ

২। অমরত্বের বিষ পারদ খেয়ে একের পর এক চীন সম্রাটের মৃত্যু

2 thoughts on “মৃত লাশ গেল জীবন্ত লাশ দেখতেঃ আইনের অনৈতিক বাতাবরণে বন্দি মানবিকতা”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top