ভারতের উত্থানের নেপথ্যে বহুত্ববাদ: আবুল কালাম আজাদ, হুমায়ুন কবীর ও রাষ্ট্রগঠনের এক অনন্য ইতিহাস

বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র, অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি, তথ্যপ্রযুক্তিতে পরাশক্তি এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র—আজকের ভারতকে আমরা সাধারণত এভাবেই চিনি। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে কেবল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ বা রাজনৈতিক নেতৃত্বই কাজ করেনি। বরং স্বাধীনতার পর দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান এবং প্রতিষ্ঠান গঠনের যে ভিত্তি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটিই ভারতের সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ।

আর সেই ভিত্তি নির্মাণে যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুইজন হলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং হুমায়ুন কবীর। বিস্ময়কর ব্যাপার যে, ভারত নামে হিন্দু রাষ্ট্র (হিন্দুস্তান) হলেও তাঁরা দুজনই ছিলেন মুসলিম। য়াজও কলকাতায় তার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান।

একইভাবে ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচি, শিল্পায়ন এবং সামরিক শক্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের মানুষের অসামান্য অবদান রয়েছে, যাদের অনেকেই একেবারেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের।

এই ইতিহাস আমাদের শেখায়—একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং মেধাকে মূল্যায়ন করার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত।

এই নিবন্ধে এমন কয়েকজনকে নিয়েই আলচনা।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ: স্বাধীন ভারতের শিক্ষা স্থপতি

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৮৮৮–১৯৫৮) ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী। তাঁর নামের আগে “মাওলানা” উপাধি কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নয়; ইসলামি দর্শন, কোরআনের তাফসির, আরবি, ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যবহৃত হয়।

তিনি বিশ্বাস করতেন, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন একটি জাতি শিক্ষায় আত্মনির্ভর হবে।

আজাদ উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন শুরু হয়, প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (UGC)-এর ভিত্তি। গড়ে ওঠে আধুনিক প্রযুক্তি শিক্ষার পরিকল্পনা।

১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত প্রথম আইআইটি খড়গপুর ছিল তাঁর দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্নের বাস্তব রূপ। পরবর্তীকালে যে আইআইটি নেটওয়ার্ক ভারতকে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি শক্তিতে পরিণত করতে সাহায্য করেছে, তার বীজ বপন করেছিলেন এই শিক্ষামন্ত্রী।

হুমায়ুন কবীর: পূর্ব বাংলার সন্তান, ভারতের শিক্ষানীতির অন্যতম নির্মাতা

হুমায়ুন কবীর (১৯০৬–১৯৬৯)-এর পৈতৃক নিবাস ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার ফরিদপুরে

তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা করেন এবং অক্সফোর্ড ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন—যা ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের জন্য বিরল সম্মান।

শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও প্রশাসক—সব পরিচয়েই তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল।

মাওলানা আজাদের মৃত্যুর পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে তিনি উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রণয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন।

ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।

আইআইটি: একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ফল

আজ বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ভারতীয়দের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়।

গুগলের সুন্দর পিচাই, মাইক্রোসফটের সত্য নাদেলা, আইবিএমের সাবেক প্রধান অরবিন্দ কৃষ্ণ—এরা সবাই ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

অবশ্যই এ সাফল্যের পেছনে শুধু আইআইটির অবদান নয়। ভারতের প্রকৌশল শিক্ষা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, অর্থনৈতিক সংস্কার, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের সুযোগ—সবকিছু মিলিয়েই এই অবস্থান তৈরি হয়েছে।

তবে এটিও সত্য যে, আইআইটির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত না হলে ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রযাত্রা এত দ্রুত হতো কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

হোমি জে. ভাবা: ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক

ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক হিসেবে পরিচিত হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা ছিলেন পারসি (জরথ্রুস্ট ধর্মাবলম্বী)।

তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ভারতের পরমাণু শক্তি কমিশনের নেতৃত্ব দেন।

ভারতের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক গবেষণা থেকে শুরু করে পরবর্তী সামরিক সক্ষমতার ভিত্তি মূলত তাঁর হাতেই নির্মিত হয়।

ড. এপিজে আবদুল কালাম: ভারতের ‘মিসাইল ম্যান’

ড. এপিজে আবদুল কালাম ছিলেন একজন মুসলিম বিজ্ঞানী, যিনি ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশ কর্মসূচিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান।

তিনি অগ্নি ও পৃথ্বী ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির নেতৃত্ব দেন এবং ১৯৯৮ সালের পোখরান পারমাণবিক পরীক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীকালে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হন এবং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে কোটি মানুষের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

পারসিদের অবদান: সংখ্যায় কম, অবদানে বিশাল

ভারতে পারসি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অত্যন্ত কম—মোট জনসংখ্যার সামান্য অংশ।

কিন্তু তাদের অবদান অসামান্য।

টাটা গ্রুপ, গোদরেজ, ওয়াডিয়া, শাপুরজি পালোনজি—ভারতের শিল্পোন্নয়নের ইতিহাসে এই পরিবারগুলোর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা।

স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের শিল্পায়ন, বিমান চলাচল, ইস্পাত শিল্প, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি—সবখানেই পারসিদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।

স্যাম মানেকশ: একজন পারসি সেনাপ্রধান

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সেনাপ্রধান ছিলেন ফিল্ড মার্শাল স্যাম হরমুসজি ফ্রামজি মানেকশ

তিনি ছিলেন পারসি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর সামরিক নেতৃত্ব আজও বিশ্বজুড়ে সামরিক শিক্ষায় আলোচিত হয়।

ভারতের মতো বিশাল দেশে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য দেশের সর্বোচ্চ সামরিক পদে অধিষ্ঠিত হওয়া রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়—যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া।

অটোমান রাজবংশ ও হায়দরাবাদ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

শেষ অটোমান খলিফা আবদুল মজিদের কন্যা দুররুশেহভার সুলতান পরে হায়দরাবাদের নিজাম পরিবারের যুবরাজ আজম জাহকে বিয়ে করেন।

এর মাধ্যমে তুর্কি অটোমান রাজপরিবারের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের একটি ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

এটি কেবল একটি রাজকীয় বিবাহ নয়; বরং ভারত যে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আশ্রয় দিয়েছে, তারও একটি প্রতীক।

ভারতের শিক্ষা ও রাষ্ট্রগঠনের দর্শন

স্বাধীনতার পর ভারতের প্রথম প্রজন্মের নেতৃত্ব একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে বুঝেছিল—রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করতে হলে আগে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও গবেষণাকে শক্তিশালী করতে হবে।

এই কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, মহাকাশ গবেষণা, পারমাণবিক বিজ্ঞান—সব ক্ষেত্রেই ধারাবাহিক বিনিয়োগ করা হয়েছে।

ফলাফল তাৎক্ষণিক আসেনি।

কিন্তু কয়েক দশক পর সেই বিনিয়োগের সুফল হিসেবে ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

বহুত্ববাদ কি ভারতের শক্তির অন্যতম ভিত্তি?

ভারতের ইতিহাসে মুসলিম, হিন্দু, শিখ, পারসি, খ্রিস্টান, ইহুদি, বৌদ্ধসহ নানা সম্প্রদায়ের মানুষের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

অবশ্যই ভারতের ইতিহাসে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, বৈষম্য ও সংঘাতও ঘটেছে। তাই ভারতকে সম্পূর্ণ বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বলা যাবে না।

তবে রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা, শিক্ষা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

এই নীতিই ভারতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।

উপসংহার

কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল বাজেট, সংবিধান কিংবা রাজনৈতিক স্লোগানের ওপর নির্ভর করে না। প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি, শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থা, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি—যোগ্য মানুষের জন্য সমান সুযোগ।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, হুমায়ুন কবীর, হোমি জে. ভাবা, এ. পি. জে. আবদুল কালাম, স্যাম মানেকশ কিংবা টাটা পরিবারের ইতিহাস আমাদের সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয়, যখন সে নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের আগে তার মেধা, সততা ও যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করে। ইতিহাসের বহু সফল রাষ্ট্রের মতো ভারতও সেই নীতির বহু উদাহরণ রেখে গেছে—যদিও সেই আদর্শ সব সময় সমানভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, এমন দাবি করা যাবে না।

ইতিহাসের শিক্ষা হলো, বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারলেই একটি জাতি দীর্ঘমেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে।

আরও পড়ুনঃ মমতা যুগের অবসান – পশ্চিমবঙ্গে নতুন আধ্যায়ের সূচনা

Scroll to Top