১২ই ফেব্রুয়ারিঃ যে ঘুড়ি উড়বে কিন্তু টিকবে না

ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়ানোর সময় একটি দৃশ্য খুব পরিচিত ছিলো। লেজ ছিঁড়ে গেলে কেউ কেউ থুথু দিয়ে জোড়া লাগাতো। দূর থেকে মনে হতো—ঘুড়ি আবার ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু আকাশে উঠতে না উঠতেই প্রথম ঝাপটা বাতাসে ঘুড়ির লেজ ছিঁড়ে আগে উড়ে যেতো, আর ঘুড়ি পড়তো মাটিতে। ঘুড়ি নয়—আসলে পড়ে যেতো সেই আয়োজনের বিশ্বাসযোগ্যতা। ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে […]

ছোটবেলায় ঘুড়ি ওড়ানোর সময় একটি দৃশ্য খুব পরিচিত ছিলো। লেজ ছিঁড়ে গেলে কেউ কেউ থুথু দিয়ে জোড়া লাগাতো। দূর থেকে মনে হতো—ঘুড়ি আবার ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু আকাশে উঠতে না উঠতেই প্রথম ঝাপটা বাতাসে ঘুড়ির লেজ ছিঁড়ে আগে উড়ে যেতো, আর ঘুড়ি পড়তো মাটিতে।

ঘুড়ি নয়—আসলে পড়ে যেতো সেই আয়োজনের বিশ্বাসযোগ্যতা।

১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বাংলাদেশ আজ অনেকটা সেই দৃশ্যের দিকেই এগোচ্ছে।

নির্বাচন আছে, কিন্তু প্রতিযোগিতা নেই

একটি নির্বাচন মানে শুধু ভোটকেন্দ্র খোলা নয়। নির্বাচন মানে অংশগ্রহণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জনস্বীকৃতি। কিন্তু দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে, সেখানে প্রতিযোগিতা কার্যত অনুপস্থিত।

ব্যালট থাকবে, বাক্স থাকবে, কেন্দ্র থাকবে—কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে:
কার সঙ্গে কার নির্বাচন?

এটা যেন এমন এক দৌড়, যেখানে স্টার্টিং লাইনে একজনই দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ফিনিশ লাইনে মেডেল প্রস্তুত।

কাগজে গণতন্ত্র, মাঠে ফাঁকা

নির্বাচনী তফসিল, আচরণবিধি, কমিশনের ঘোষণা—সবই কাগজে ঠিকঠাক। কিন্তু মাঠে যে রাজনীতি দেখা যাচ্ছে, সেখানে উত্তেজনা নেই, বিতর্ক নেই, জনসম্পৃক্ততা নেই।

ভোটার যেন নাগরিক নয়—একজন নীরব পর্যবেক্ষক। ভাবটা এমন, “ভোট দিতে চাইলে দিন, না দিলেও সমস্যা নেই। ফলাফল ঠিকই হবে।”

এই অবস্থায় নির্বাচন নয়, বরং একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আন্তর্জাতিক বাতাসে থুথু-লাগানো লেজ

দেশের ভেতরে কোনোভাবে ঘুড়ি উঠলেও আন্তর্জাতিক আকাশে বাতাস অনেক শক্ত। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ কিংবা জাতিসংঘ—এরা নির্বাচন দেখে শুধু কেন্দ্র নয়, অংশগ্রহণের মাত্রা

ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে—

(১) নির্বাচন কতোটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?

(২) প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া এই ফল কতটা গ্রহণযোগ্য?

(৩) নতুন সরকার কতোটা প্রতিনিধিত্বশীল হবে?

এই প্রশ্নগুলোই সেই বাতাস, যা থুথু দিয়ে লাগানো লেজকে বেশিক্ষণ টিকতে দেয় না।

ফল ঘোষণা হবে, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা?

নির্বাচন যদি হয়েই যায়, ১২ই ফেব্রুয়ারির পরে হয়তো বিজয়ী ঘোষণা হবে। সংসদ গঠিত হবে। শপথও হবে।
কিন্তু তারপর শুরু হবে আসল পরীক্ষা—
এই সরকার কতোটা কার্যকরভাবে দেশ চালাতে পারবে,
আর কতটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়াতে পারবে?

কারণ ইতিহাস বলে—
প্রতারণা করে, শক্তি ও কৌশল খাটিয়ে ভোট ছাড়াই ক্ষমতা পাওয়া যায়, কিন্তু বৈধতা ধরে রাখা যায় না।

শেষ কথা

ড: ইউনুস সরকারের যেরকম নড়াচড়া দেখছি, মনে হচ্ছে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটা হয়েই যাবে। ব্যবস্থাপনাগত কোনো ঘাটতি থাকবে না। কিন্তু গণতন্ত্র শুধু সময়মতো কিছু আয়োজনের নাম নয়—এটা ভারসাম্যের খেলা।

থুথু দিয়ে জোড়া দেয়া লেজ ছিঁড়ে গেলে লেজ ছাড়া ঘুড়ি কিছুক্ষণ উড়তে পারে,
ছবি তোলা যায়, সংবাদ হয়।
কিন্তু বাতাস এলে সত্য লুকিয়ে থাকে না।

আর তখন আমরা আবার দেখবো—
ঘুড়ির আগে উড়ছে লেজ,
আর নিচে পড়ছে পুরো আয়োজন।

কারণ ইতিহাস খুব নির্মম—
ইতিহাস থুথু দিয়ে জোড়া দেওয়া লেজে বিশ্বাস করে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top