০৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে নির্বাসিত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ই-মেইলের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আসছেন শেখ হাসিনা। দুই বছর পর ২০২৬ সালের ০৫ আগস্ট এই প্রথম তিনি সরাসরি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন। স্থানীয় সময় সন্ধ্যে ৬ টায় দিল্লিস্থ “ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া” কর্তৃক আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টাররা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম অনলাইনে যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করে।
অনলাইনে প্রচারিত সম্পূর্ণ অনুষ্ঠানটি দেখলাম। কয়েকজন বক্তার বক্তব্যের পর মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন বিশ্বের সর্বাধিক সময় সরকার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশের ৫ বারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ হাসিনা।
ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তৃতা দিলেও তিনি তার ছবি দেখাননি। তবে তিনি সকলকে দেখতে পেয়েছেন। বক্তৃতা শেষে সাংবাদিকদের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্বে তার পক্ষে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে দায়িত্ব দিলেও পরবর্তীতে দেখা গেলো অনেক প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন।
অনুষ্ঠানে স্বশরীরে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র সাংবাদিক সুলতানা রহমান। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক থেকে দিল্লি এসে যোগ দেন তিনি। বর্তমানে তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে “New York Bangla Live” নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল পরিচালনা করেন। তার এক প্রশ্নের জবাবে জয় বলেন, ‘এই প্রশ্নের উত্তর মা দিতে পারবেন, কিন্তু তিনি মনেহয় সংযুক্ত নেই। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে কথা বলে ওঠেন শেখ হাসিনা- “না I’m here, I can answer, no problem”.। তারপর একে একে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিয়েছেন শেখ হাসিনা।
গত দুই বছরে গণমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর যত যোগাযোগ হয়েছে, তার মধ্যে এটিই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পুরো বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি আমার নজর কেড়েছে, তা হলো তাঁর আত্মবিশ্বাস ও সতেজতা। তিনি নির্দিষ্ট দিন-তারিখ না বললেও বারবার দৃঢ়ভাবে বলেছেন, ডিসেম্বরে তিনি দেশে ফিরবেন। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। তাঁর ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও একাত্তরের বাংলাদেশ আজ যেভাবে আক্রমণের মুখে, তা রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েই তিনি ফিরবেন।
অনুষ্ঠানে ‘দ্য হিন্দু’র সাংবাদিক সুহাসিনী হালদারের বহুল আলোচিত ‘ক্ষমা চাওয়ার’ প্রসঙ্গ ওঠে। এর জবাব দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘যদি এক পক্ষ হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার না করে, বিচার এড়িয়ে যায় বা দায়মুক্তি পায়, তাহলে শুধু অন্য পক্ষের কাছেই ক্ষমা চাওয়ার দাবি কেন তোলা হবে?’ তিনিই উল্টো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন।
স্বাভাবিকভাবেই ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের সেই বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেছেন, যেখানে সরকার পতনের ঘটনাকে ড: মুহাম্মদ ইউনুস “meticulously designed” বা সুপরিকল্পিত বলে বর্ণনা করেছিলেন। সেই প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনার প্রশ্ন ছিল, ‘যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো- অরাজকতা ঠেকানো কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?’
আরেকটি বিষয় আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। সরকারি নিষেধ থাকায় দেশের বড় বড় গণমাধ্যমের অনেকেই এই সংবাদ সম্মেলন প্রচার করেনি। হয়তো তারা নিজ নিজ নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এতে কি মানুষের কাছে শেখ হাসিনার বক্তব্য পৌঁছায়নি? আমার মনে হয় নিষেধের কারণে মানুষের এবং বিদেশি গণমাধ্যমের আগ্রহটা আরো বেড়েছে। বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টার এবং ডিডব্লিউ নিউজ সহ অনেক মাধ্যম অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে। ফলে শুধু দেশে নয়, সারাবিশ্বে তা প্রচারিত হয়েছে এবং সবার কাছেই পৌঁছেছে।
এখন আর তথ্য আটকে রাখার সময় নেই। মানুষের হাতে হাতে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর নানা বিকল্প মাধ্যম রয়েছে।
মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে সম্প্রচার নিষেধ থাকলেও সরকারের শীর্ষমহল সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা অনুষ্ঠানটি দেখেছেন, যা সরাসরি সম্প্রচারের সময় অনেকের নজরে পড়েছে।
গণতন্ত্রে মানুষকে সব পক্ষের কথা শোনার সুযোগ দিতে হয়। কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া এক বিষয়, কিন্তু সেই বক্তব্য শোনার সুযোগই যদি মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়, তাহলে সত্য-মিথ্যা যাচাই করার অধিকারও সীমিত হয়ে যায়।
জনগণ সব পক্ষের কথা শুনবে, তথ্য মিলিয়ে দেখবে, তারপর নিজের বিবেক দিয়ে বিচার করবে। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জনগণের। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এটাই হওয়া উচিত।
আরও পড়ুনঃ জামাতে ইসলামীর আদর্শ, ইতিহাস, শক্তি–দুর্বলতা এবং বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে তাদের সম্ভাবনা

