অসি বড়, না মসি বড়?

ছোটবেলায় স্কুলে শুধু পড়াশোনাই হতো না। পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও উদ্বুদ্ধকরণমূলক কর্মকাণ্ডও হতো। কবিতা আবৃত্তি, গান, নাটক, তর্কযুদ্ধ, শ্রেণিতে শ্রেণিতে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। একদিন এমনই এক তর্ক প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল— “অসি বড়, না মসি বড়?” অসি মানে তরবারি, আর মসি মানে কলম। দুই পক্ষের দুজন বিতার্কিক মঞ্চে উঠল। একজন অসির পক্ষে, অন্যজন মসির […]

ছোটবেলায় স্কুলে শুধু পড়াশোনাই হতো না। পড়াশোনার পাশাপাশি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও উদ্বুদ্ধকরণমূলক কর্মকাণ্ডও হতো। কবিতা আবৃত্তি, গান, নাটক, তর্কযুদ্ধ, শ্রেণিতে শ্রেণিতে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।

একদিন এমনই এক তর্ক প্রতিযোগিতার বিষয় ছিল—

“অসি বড়, না মসি বড়?”

অসি মানে তরবারি, আর মসি মানে কলম।

দুই পক্ষের দুজন বিতার্কিক মঞ্চে উঠল। একজন অসির পক্ষে, অন্যজন মসির পক্ষে।

তবে একটা বিষয় আগে থেকেই মোটামুটি ঠিক করা থাকতো। শিক্ষকদের একটা প্রবণতা ছিল—কোনো না কোনোভাবে অসিকেই জিতিয়ে দিতে হবে।

মসির পক্ষের বক্তাও সেটা জানতো। ফলে তার বক্তব্য এমনভাবেই সাজানো হতো, যেন শেষ পর্যন্ত অসির কাছেই তাকে হার মানতে হয়।

কারণটাও খুব সহজ।

শিক্ষকরা চাইতেন, শিক্ষার্থীরা যেন পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেয়। সবাই যদি লেখাপড়া বাদ দিয়ে ডাংগুলি, লাঠিসোঁটা আর নকল তরবারি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে শিক্ষিত সমাজ তৈরি হবে কীভাবে?

আর বাস্তবতাও হলো—তরবারি চালাতেও বুদ্ধি লাগে। যুদ্ধ করতেও কৌশল লাগে। সেই বুদ্ধি ও কৌশল অর্জনের অন্যতম মাধ্যম হলো শিক্ষা। অর্থাৎ, অসির শক্তির পেছনেও মসির শক্তি আছে।

আরেকটি যুক্তি দেওয়া হতো—

তুমি অসি হাতে যুদ্ধ করে যতই জিতো, শেষ পর্যন্ত যখন বিচারের মুখোমুখি হবে, তখন বিচারকের হাতে থাকা কলমের একটি খোঁচাতেই তোমার ভাগ্য নির্ধারিত হয়ে যাবে!

অতএব, যুক্তির শেষ কথা—

“মসির চেয়ে অসি বড়!”

ছোটবেলায় এসব শুনে বেশ মজাই লাগতো। গর্ব অনুভব করতাম, আমরা যেহেতু পড়াশুন করছি, আর মসি যেহেতু সেরা, অতএব, আমরাই সেরা!

কিন্তু বড় হয়ে বুঝলাম, ইতিহাস কখনো কখনো তর্কের মঞ্চের সেই স্ক্রিপ্টও উল্টে দেয়।

৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর যেন হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে গেলো।

এবার অসিরা দলবল নিয়ে মসিদের বিদায় করতে শুরু করলো। আর সেই আঘাতের বড় অংশ গিয়ে পড়ল বিচারালয় ও শিক্ষালয়ে্র উপর।

উল্লেখ্য, সেই ঝড় এখনো থামেনি।

“০৯ আগষ্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশে এমনই এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে গেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

আদালত চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ মোঃ উজ্জ্বল মাহমুদের একটি মন্তব্য এবং এজলাসে ভিডিও ধারণ করাকে কেন্দ্র করে উপস্থিত আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সাথে কথাকাটাকাটি হয়। উত্তেজনা বাড়তে বাড়তে একপর্যায়ে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আসামী একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা হওয়ায় তারা অনুসারিরা আদালতের এজলাসের দরজা-জানালা এবং বিচারকের খাসকামরার দরজার কাচ ভাঙচুর করে।”

ব্যাপারটা যেন অনেকটা এমন—

শিক্ষকদের উদ্দেশে:

“স্কুলে আমাদের ভয় দেখিয়েছিস! তর্কে জিততে দিসনি! সব সময় অসির পক্ষ নিয়ে অসিকেই জিতিয়েছিস! এবার দেখ!”

আর বিচারকদের উদ্দেশে:

“তোমরাও তো বিচারকের আসনে বসার বাসনা নিয়ে আমাদের তর্কে হারিয়েছো! এবার দেখো, কার হাতে ক্ষমতা!”

এরপর অনেকটা সময় পার হয়ে আবার মনে পড়ল—

আরে, শিক্ষক আর বিচারকদের শাস্তি দিলেই তো হবে না! আসল নাটের গুরু তো শিক্ষামন্ত্রী!

অসিদের তৈরি করার কারখানা, অর্থাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়—সেটাও তো তার অধীনেই ছিল!

কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী তো দেশে নেই – “পোড়াও বাড়ি!”

তাই বাড়িঘর পোড়ানোর মতো প্রতিশোধের ভাষা, প্রতিষ্ঠান ভাঙার মতো উন্মাদনা—সবকিছুর মধ্যেই যেন একটা অদ্ভুত হিসাব মেলানোর চেষ্টা।

শেষ পর্যন্ত তাই শিক্ষকদের এবং বিচারকদের যেন বলতে হচ্ছে—

“মসি জয়যুক্ত হয়েছে!
মসি জয়যুক্ত হয়েছে!
মসি জয়যুক্ত হয়েছে!”

তবে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—

মসি জয়যুক্ত হয়েছে, নাকি মসির নামে নতুন করে অসিরই রাজত্ব শুরু হয়েছে?

আজকের প্রজন্মের সামনে যদি আবার সেই পুরোনো তর্কের বিষয় আসে—

“অসি বড়, না মসি বড়?”

তাহলে হয়তো বিতর্কের স্ক্রিপ্ট আর আগের মতো হবে না।

শিক্ষকরা এবার হয়তো বলবেন—

“মসি বড়!”

কারণ এখন সবাই জানে, মসির শক্তি কতটা!

এমনকি হয়তো একদিন এমন অবস্থাও আসবে, যখন কেউ আর বিচারকের আসনে বসতেই চাইবে না।

কারণ বিচারকের হাতে থাকা কলমটাই যদি সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হয়ে যায়, তাহলে ন্যায়বিচারের আসনে বসবে কে?

আর শেষ পর্যন্ত যদি মসির ভয়ে সবাই মসির পক্ষেই থাকতে চায়, তাহলে প্রশ্নটা আবার ফিরে আসবে—

অসি বড়, না মসি বড়—নাকি বড় হলো যার হাতে ক্ষমতা?

ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন তর্কটা বোধহয় এখানেই।

আরও পড়ুনঃ জামাতে ইসলামীর আদর্শ, ইতিহাস, শক্তি–দুর্বলতা এবং বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে তাদের সম্ভাবনা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top