খারিয়া বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, যারা প্রধানত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বসবাস করে। বিশেষ করে দিনাজপুর, নওগাঁ, রাজশাহী এবং আশপাশের এলাকায় তাদের বসতি দেখা যায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের ঝাড়খণ্ড, উড়িশ্যা এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে খারিয়া জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে।
উৎপত্তি ও ইতিহাস
খারিয়া জনগোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ার প্রাচীন অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ বলে মনে করা হয়। ঐতিহাসিকভাবে তাদের আদি নিবাস ভারতের ঝাড়খণ্ড ও আশপাশের পার্বত্য-অরণ্য অঞ্চল। ব্রিটিশ আমলে শ্রমিক হিসেবে অনেক খারিয়া মানুষকে বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানান্তর করা হয়। সেই সময়ের মধ্যেই কিছু পরিবার বর্তমান বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে এবং ধীরে ধীরে স্থানীয় সমাজের সঙ্গে মিশে যায়।
খারিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকলেও আধুনিক সামাজিক পরিবর্তনের কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাদের ঐতিহ্য পরিবর্তিত হয়েছে।
ভাষা
খারিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা খরিয়া ভাষা, যা অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাপরিবারের মুন্ডা শাখার অন্তর্ভুক্ত। এই ভাষা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে বসবাসকারী অনেক খারিয়া মানুষ বর্তমানে বাংলা ভাষাই বেশি ব্যবহার করে। ফলে তাদের মাতৃভাষা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
ধর্ম ও বিশ্বাস
ঐতিহ্যগতভাবে খরিয়ারা প্রকৃতিপূজারী ছিল এবং বন, পাহাড়, নদী ও পূর্বপুরুষদের আত্মার প্রতি তাদের বিশেষ বিশ্বাস ছিল। বর্তমানে—অনেক খরিয়া খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। কিছু পরিবার এখনও তাদের ঐতিহ্যবাহী লোকবিশ্বাস অনুসরণ করে। আবার কিছু মানুষ স্থানীয় হিন্দু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানও পালন করে।
ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের সময় গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে নাচ-গান ও সামাজিক ভোজের আয়োজন করে।
জীবনযাপন ও অর্থনীতি
খরিয়া জনগোষ্ঠীর প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। তারা ধান, ভুট্টা, শাকসবজি ও বিভিন্ন স্থানীয় ফসল চাষ করে। এছাড়া অনেকেই দিনমজুরি, কৃষিশ্রম বা ছোটখাটো ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
গ্রামীণ পরিবেশে তাদের বসতি সাধারণত মাটির দেয়াল ও টিন বা খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি হয়। পরিবারভিত্তিক কৃষিকাজ ও পারস্পরিক সহযোগিতা তাদের সমাজ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
একটি খারিয়া পরিবার

সংস্কৃতি
খারিয়া জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংগীত, নৃত্য ও লোকসংস্কৃতি রয়েছে। উৎসবের সময় তারা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নাচ-গান করে এবং সামাজিক আনন্দ-উৎসবে অংশ নেয়।
তাদের সংস্কৃতিতে প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। লোক-কাহিনি, গান এবং আচার-অনুষ্ঠানে সেই সম্পর্কের প্রতিফলন পাওয়া যায়।
বিবাহ প্রথা
খারিয়া সমাজে সাধারণত পারিবারিক সম্মতির মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়। একই গোত্রে বিয়ে সাধারণত নিষিদ্ধ। বিয়ের সময় সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, গান, নাচ এবং ভোজের আয়োজন করা হয়।
খারিয়া সমাজে বিয়ে শুধু দুই ব্যক্তির সম্পর্ক নয়, বরং দুই পরিবারের মধ্যে সামাজিক বন্ধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।
শিক্ষা ও বর্তমান অবস্থা
আগে খারিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার কম ছিল। তবে বর্তমানে শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অনেক খারিয়া ছেলে-মেয়ে এখন স্কুলে যাচ্ছে এবং উচ্চশিক্ষার দিকেও আগ্রহী হচ্ছে।
তবুও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, ভূমি সমস্যা এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ তাদের সমাজে এখনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
আনুমানিক জনসংখ্যা
বাংলাদেশে খারিয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী তাদের সংখ্যা আনুমানিক ১০–১৫ হাজারের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের আদিবাসী সমাজ | কোচ সম্প্রদায়







Leave a Reply