ভারতের গ্রামীণ জনপদে ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অনেক সময় এতোটাই অস্পষ্ট হয়ে যায় যে, সেখানে মানুষ নিজেদেরকে না হিন্দু, না মুসলিম – নিজ বলয়ে স্ব স্ব ধর্ম পালন করলেও মানুষ হিসেবেই নিজেদের পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। শুধু ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নয়, এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক সমন্বয়বাদ। ফলে শতাব্দী প্রাচীন সামাজিক সহাবস্থানের ইতিহাস, আত্মীয়তা ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। বিষয়টি ভারতের একাধিক অঞ্চলের একাধিক গ্রামে জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে বিদ্যমান। তার কিছু উল্লেখযোগ্য দিক নিচে তুলে ধরা হলো।
একই প্রাঙ্গণে মসজিদ ও মন্দির: কাশ্মীরের ত্রেহগাম
জম্মু ও কাশ্মীরের কুপওয়ারা জেলার ‘ত্রেহগাম’ গ্রামে একটি বিশাল জামে মসজিদ ও একটি হিন্দু মন্দির শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই প্রাঙ্গণে অবস্থিত। মসজিদ প্রাঙ্গণেই রয়েছে সুফি সাধক সৈয়দ ইব্রাহিম বুখারির সমাধি, যাতে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ই শ্রদ্ধা করে। অন্যদিকে মন্দিরটি উৎসর্গীকৃত হিন্দু দেবতা ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই দুই উপাসনালয়কে পাশাপাশি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রচারের লক্ষ্যে। এটি কাশ্মীরের শতাব্দী-প্রাচীন সমন্বয়বাদী সংস্কৃতির এক জলজ্যান্ত প্রমাণ ।
কর্ণাটকের গ্রাম: যেখানে মসজিদ প্রাঙ্গণে গণেশ ও মহররমে হিন্দুদের অংশগ্রহণ চলমান
কর্ণাটকের রণ তালুকের সন্দিগাওয়াড় গ্রামটি সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। গত তিন বছর ধরে এখানে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায় যৌথভাবে গণেশোৎসব পালন করছে। গ্রামের মসজিদ প্রাঙ্গণেই গণেশ প্রতিমা স্থাপন করা হয় । মুসলিমরা পূজার আয়োজনে সক্রিয় সহযোগিতা করে। অপরদিকে রমজান মাসে আবার হিন্দুরা অংশগ্রহণ করে। গ্রামবাসীদের দাবি, “আমাদের কখনো কোনো সংঘর্ষ হয়নি, আমরা একতাবদ্ধ” ।
অন্যদিকে, কর্ণাটকেরই কিছু গ্রামে মহররম পালনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এক ভিন্ন মাত্রা পায়। সেখানে হিন্দু বাসিন্দারা মুসলিম ফকিরের বেশ ধারণ করে ‘রিওয়াত’ গান পরিবেশন করেন। ‘রিওয়াত’ গান ইসলামি ও হিন্দু উপাদানের মিশ্রণে তৈরি এক অনন্য লোকসংগীত । এছাড়া হায়দ্রাবাদ-কর্ণাটক সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ইয়াদগিরি জেলায় হিন্দুরাও মহররম উৎসব পালন করে এবং ‘আলাই ভোসাই কুনিথা’ নামক একটি লোকনৃত্য পরিবেশন করে।
আগ্রার সধান গ্রাম: ভাগ করা পূর্বপুরুষের গল্প
আগ্রার কাছে সধান গ্রামে ২০,০০০ বাসিন্দার বসবাস। এখানে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি এতোটাই গভীর যে, এখানে মুসলিমদের হিন্দু নাম এবং হিন্দুদের মুসলিম নাম রাখা সাধারণ ব্যাপার । এমনকি এখানে মিশ্র-ধর্মীয় পরিবারও রয়েছে। তারা একাধারে মুসলিম ধর্মীয় আচার পালন এবং হিন্দু ধর্মীয় উৎসবে যোগদান করে থাকেন।
স্থানীয়দের মতে, ১৭শ শতকে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এখানে ব্যাপক ধর্মান্তর ঘটলেও, ২০শ শতকের শুরুতে আবার অনেকেই হিন্দুধর্মে ফিরে আসেন। এই ঐতিহাসিক ঘটনা তাদের এই বিশ্বাসে পরিণত করেছে যে, ধর্মান্তর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, মানুষ হিসেবে ভাগ করা পরিচয়টাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ । গ্রামের হিন্দু পুরোহিত গণেশ তাঁর আশ্রমকে ‘ইসলাম ও হিন্দুধর্মের মধ্যে তরলতার স্থান’ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এখানে মুসলিম সাধক ও হিন্দু দেবী কালী দুজনকেই পূজা করা হয় ।
মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া: দরগায় হিন্দুদের ভক্তি
মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে দরগায় হিন্দুদের মধ্যে পীরের পূজা করা শতাব্দী প্রাচীন একটি রীতি। ওসমানাবাদ ও লাতুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে হাজার হাজার হিন্দু পরিবার শতাব্দীর পরম্পরা অনুসরণ করে দরগায় ‘কান্দুরি’ বা বার্ষিক ভোজের আয়োজন করে। তাঁরা পীরের মাজারে পশু কুরবানি দেন, নিবেদন করেন এবং একসাথে ভোজন করেন । স্থানীয় হিন্দু মহিলারা বলেনঃ
“পীর আমাদের দেবতা, আমরা পূজা চালিয়ে যাবো। আমাদের দাদা করতেন, বাবা করতেন, আমরাও করবো” ।
এই দরগাগুলো হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।
উড়িশ্যা ও বিহার: উৎসবে মিলনের বন্ধন
উড়িশ্যার রেমান্ডা গ্রামে এখনও একটি মুসলিম পরিবার বার্ষিক রথযাত্রার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। বিহারের পিরু ও বাঁতারা গ্রামে মুসলিম বিবাহে হিন্দু রীতিনীতি যেমন গায়ে হলুদ সহ সিঁদুর দেওয়া এবং বিবাহমণ্ডপে লাঙল চালানোর প্রথা রয়েছে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো, এসব বিবাহে রাজা দশরথ ও ভগবান রামের গান গাওয়া হয়, যা স্পষ্টতই তাদের হিন্দু পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য বহন করে ।
বিশ্লেষণ: ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে ভাগ করে নেয়া সংস্কৃতি
এই উদাহরণগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো ভারতের ‘গঙ্গা-জমুনি তহজীব’-এর জীবন্ত রূপ। ‘পাভন কে বর্মা’ তাঁর এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মির্যা গালিব ও মীর তাকি’র মতো কবিরা বহু আগেই ধর্মীয় গোঁড়ামির সমালোচনা করেছেন, মানবিকতার কথা বলেছেন ।
তবে এই সমন্বয়বাদী চিত্র বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জের মুখে। নানা রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক শক্তি এই সম্প্রীতিকে ভাঙার চেষ্টা করছে । তথাপি এই গ্রামগুলোর মানুষ প্রমাণ করে চলেছে যে, ধর্মীয় পার্থক্যের মধ্যেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভাগাভাগি করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তাঁরা ভারতের বহুত্ববাদী সমাজের এক অমূল্য সম্পদ এবং আমাদের সকলের কাছে এক অনন্য শিক্ষা।
আরও পড়ুনঃ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল মেলবন্ধন পশ্চিমবঙ্গের মঙ্গলকোট







Leave a Reply