ইংল্যান্ড–আমেরিকা-ভারত: স্থির রাজনীতি; বাংলাদেশে কেন অস্থিরতা?

ইংল্যান্ডের শীর্ষ রাজনৈতিক দল তিনটি—
(১) লেবার, (২) কনজারভেটিভ, (৩) লিবারেল ডেমোক্র্যাট
দশকের পর দশক ধরে এই দলগুলোর হাতেই দেশ পরিচালিত হয়েছে। মতভেদ থাকলেও রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি, জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক শৃঙ্খলা নিয়ে তাদের মধ্যে বড় কোনো বিরোধ নেই। ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিশীলতা নষ্ট হয় না।

একই বাস্তবতা আমেরিকাতেও—ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই দলই ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশ পরিচালনা করছে। তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও রাষ্ট্রের মূল দর্শন, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে কারো সাথে কারো শত্রুতামূলক সংঘাত নেই।

ভারতেও বড় পর্যায়ের স্থিতিশীলতা লক্ষ্য করা যায়—বিশেষত কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে দুইটি বড় দল দীর্ঘ সময় ধরে প্রাধান্য রেখেছে: ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তবুও ভারতীয় রাজনীতি আরও বেশি বহুধার্মিক—রাজ্যভিত্তিক শক্তিগুলো (যেমন তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, তেলঙ্গানা ইত্যাদি) কেন্দ্রে বড় প্রভাব রাখে।

ভারতীয় গণতন্ত্রে আঁচ পড়ার মতো বড় ধরণের ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠানগত ধারাবাহিকতা দেখা যায়—সাংবিধানিক কাঠামো, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন প্রভৃতি দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর। অবশ্যই মতপার্থক্য, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং এলাকার স্বার্থ অনেক সময় সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে; তবুও ভারতের বহুসংখক জনগোষ্ঠী ও রাজ্যভিত্তিক রাজনৈতিক ভারসাম্য এক ধরনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

তাহলে বাংলাদেশের সমস্যা কোথায়?

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকারী চক্র দেশকে ‘স্বৈরাচার মুক্ত’ করার নামে উল্লাস করেছিল—যা ছিল পরাজিত শক্তির অপপ্রচারেরই পুনরাবৃত্তি।

বঙ্গবন্ধু কি স্বৈরাচারী ছিলেন?

স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শৃঙ্খলা, পুনর্গঠন ও রাষ্ট্র গঠনের যে জরুরি রাজনৈতিক কাঠামো তিনি তৈরি করেছিলেন, তা চক্রান্তকারীরা বিকৃতভাবে প্রচার করে তাকে স্বৈরাচার বলে দেগে দেয়। দেশের ওপর তখনই সামরিক শাসনের ভারী ছায়া নেমে আসে—এবং শুরু হয় দীর্ঘ অস্থিরতার পথযাত্রা।

সামরিক শাসন ও নতুন দলের জন্ম

হত্যার পর সামরিক শাসকরা একের পর এক ক্ষমতায় টিকে থাকার সুযোগে দুটি বড় রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেন—
বিএনপি (জিয়াউর রহমান) এবং
জাতীয় পার্টি (হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ)।

জাতীয় পার্টি তুলনামূলক দুর্বল হলেও তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিকে ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান মেরুদণ্ড হয়ে ওঠে দুটি দল—আওয়ামী লীগবিএনপি। ৯০–এর গণ-অভ্যুত্থানের পর সামরিক শাসনের অবসান হলেও এই দুই দলের সীমাহীন বিরোধ ও মুখোমুখি রাজনীতি কখনোই কমেনি।

২৪এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর চিত্র পুরো বদলে যায়

২০২৪ সালের পর দেশের রাজনৈতিক চরিত্রে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।
জামায়াতে ইসলামীসহ কিছু নতুন ও উদীয়মান দল সরকারের ছত্রছায়ায় ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রবেশ করে।
স্বাধীনতার চেতনার বিরোধী অনেক গোষ্ঠী “ধোয়া তুলছে”—অর্থাৎ নিজেদের পুনরায় বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা করছে।

জনগণের মধ্যে তখন প্রচলিত হয় জনপ্রিয় সেই ব্যঙ্গ–লাইনটি—
দুই দলের একই বিষনৌকার ধানের শীষ।
অর্থাৎ দুই দলের রাজনৈতিক আচরণে মানুষ পার্থক্য খুঁজে পাচ্ছে কম।

কিন্তু বাস্তবতা হলোজনপ্রিয়তা এখনো দুই দলের হাতেই

যে যাই বলুক—
বাংলাদেশে এখনো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি–ই সবচেয়ে বড় দুটি রাজনৈতিক শক্তি।
জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করলে তারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়।
কিন্তু সমস্যাটা অন্যত্র—

বিএনপির দুর্বল নেতৃত্বই তাদের সবচেয়ে বড় সংকট

দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপির কাঠামো দুর্বল হয়েছে। তার ওপর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উচ্চাভিলাষ এবং ভুল রাজনৈতিক কৌশল—যেমন: আন্দোলনের নামে সহিংসতা, নির্বাচন বর্জন, অবাস্তব প্রত্যাশা—দলকে একের পর এক আত্মঘাতী পথে ঠেলে দিয়েছে।

ফলে দলটি নিজেই নিজের পায়ে কুড়াল মেরেছে
যেখানে জনসমর্থনের বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের দিকে চলে গেছে।

সারসংক্ষেপ

ইংল্যান্ড–আমেরিকা-ভারতে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আছে, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিত্তি নিয়ে বিবাদ নেই
বিপরীতে বাংলাদেশ—স্বাধীনতার পর থেকেই সামরিক শাসন, হত্যাকাণ্ড, পাল্টা প্রতিশোধ, দলীয় বিভাজন ও অস্থিরতা রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিকে দুর্বল করেছে।
তারই ধারাবাহিকতায় আজও বাংলাদেশ এই দুই দলের বিরোধ, নেতৃত্ব সংকট ও রাজনৈতিক স্বার্থের টানাপোড়েনে স্থিতিশীল রাজনীতি গড়ে তুলতে পারেনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top