অপরিচিত ধর্মের আলোকে: পারসি (ইরানী) ধর্মসমূহ

ইরান তথা প্রাচীন পারস্য সভ্যতা বহু ধর্ম ও দর্শনের জন্মস্থান। জরথুস্ত্রবাদ ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী, তবে এর পাশাপাশি আরও কিছু পারসি ধর্ম ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এদের মধ্যে মিথ্রায়িজম, মানিকিজম, মাজদাকিজম এবং অন্যান্য গূঢ় মতবাদ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জরথুস্ত্রবাদ ধর্ম (ইরানী)

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ধর্ম এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজকের পৃথিবীতে ইসলাম, খ্রিষ্টান, হিন্দু বা বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে কমবেশি সবাই জানে। কিন্তু এ ছাড়াও এমন কিছু প্রাচীন ধর্ম আছে, যেগুলো ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেললেও আজ সাধারণ মানুষের কাছে অনেকটাই অপরিচিত। জরথুস্ত্রবাদ বা Zoroastrianism তার অন্যতম।

উৎপত্তি ও ইতিহাস

জরথুস্ত্রবাদ পারস্যের প্রাচীন ধর্ম, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নবী জরথুস্ত্র (Zarathustra বা Zoroaster)। ধারণা করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ১০০০ সালের মধ্যে এই ধর্মের সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি পারস্য সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রধর্মে পরিণত হয়। বিশেষ করে আখেমেনীয়, সাসানীয় প্রভৃতি সাম্রাজ্যের শাসনামলে জরথুস্ত্রবাদ ছিল প্রধান শক্তি।

ধর্মগ্রন্থ ও বিশ্বাস

জরথুস্ত্রবাদের মূল ধর্মগ্রন্থ হলো আভেস্তা (Avesta)। এতে প্রার্থনা, স্তোত্র, আইন এবং ধর্মীয় বিধি-নিষেধ সংকলিত আছে।
এই ধর্মের কেন্দ্রীয় বিশ্বাস হলো—বিশ্বে দুটি শক্তির লড়াই চলছে:

  • আহুরা মজদা (Ahura Mazda) – আলো, সত্য ও কল্যাণের প্রতীক।
  • আংগ্রা মাইন্যু (Angra Mainyu বা আহরিমান) – অন্ধকার, মিথ্যা ও অশুভ শক্তির প্রতীক।

মানুষকে সবসময় সত্য, ন্যায় ও আলোর পথে থাকার জন্য উৎসাহিত করা হয়। তাদের ধর্মীয় মূলনীতি তিনটি বাক্যে সংক্ষেপ করা হয়:
সৎ চিন্তা, সৎ কথা, সৎ কাজ

উপাসনা ও ধর্মীয় প্রথা

জরথুস্ত্রীদের উপাসনালয়কে বলা হয় আগুন মন্দির (Fire Temple)। এখানে অগ্নিশিখা প্রজ্জ্বলিত রাখা হয়, যা ঈশ্বরীয় আলো ও বিশুদ্ধতার প্রতীক।
তাদের এক বিশেষ রীতি হলো Tower of Silence – মৃত্যুর পর দেহ মাটিতে বা আগুনে না দিয়ে একটি উঁচু স্থানে রেখে দেওয়া হয়, যাতে তা প্রাকৃতিকভাবে পচে যায় এবং পাখিরা খেয়ে ফেলে। এর মাধ্যমে পৃথিবী, আগুন ও জলকে অপবিত্র হওয়া থেকে রক্ষা করা হয়।

বর্তমান অবস্থা

আজ জরথুস্ত্রী সম্প্রদায় সংখ্যায় খুবই সীমিত। প্রধানত ইরানভারতের পারসি সম্প্রদায় এই ধর্ম অনুসরণ করে। জনসংখ্যা আনুমানিক কয়েক লাখ মাত্র। তবে তাদের ঐতিহ্য, দর্শন এবং ধর্মীয় নৈতিকতা বিশ্বধর্মের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখেছে।

জরথুস্ত্রবাদের প্রভাব

ইতিহাসবিদদের মতে, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলামের ধারণাগুলো—যেমন স্বর্গ-নরক, ফেরেশতা-শয়তান, শেষ বিচার—অনেকাংশে জরথুস্ত্রবাদ থেকে প্রভাবিত। তাই এটি শুধু প্রাচীন পারস্য নয়, বরং বিশ্বের ধর্মীয় ভাবনায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

মিথ্রায়িজম, মানিকিজম ও মাজদাকিজম

মিথ্রায়িজম (Mithraism)
দেবতা মিথ্রা-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এ ধর্ম সূর্য, সত্য ও চুক্তির প্রতীক হিসেবে মিথ্রাকে পূজা করত। এর আচার-অনুষ্ঠান বিশেষত গোপন মন্দিরে অনুষ্ঠিত হতো এবং প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মানিকিজম (Manichaeism)
তৃতীয় শতকে নবী মানি (Mani) এর প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। এর মূল শিক্ষা ছিল—বিশ্ব হলো আলো ও অন্ধকারের লড়াইয়ের ক্ষেত্র। মানুষকে আলো বা ন্যায়ের পথে থাকতে হবে। মানিকিজম বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও জরথুস্ত্রবাদের উপাদান মিশ্রিত করে গড়ে ওঠে এবং একসময় মধ্য এশিয়া থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল।

মাজদাকিজম (Mazdakism)
পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে মাজদাক নামের এক ধর্ম সংস্কারক সমাজে ন্যায়বিচার ও সম্পদের সমবন্টনের পক্ষে কথা বলেন। তার আন্দোলন কিছুটা সমাজতান্ত্রিক রূপ নিয়েছিল, যা প্রাচীন পারস্যের রাজনীতি ও সমাজে আলোড়ন তোলে।

উপাসনা ও ধর্মীয় প্রথা

এই পারসি ধর্মগুলিতে সাধারণত আলো, আগুন ও সূর্য পূজা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মিথ্রায়িজমে গোপন আচার, ভোজসভা ও প্রতীকী অনুষ্ঠান হতো। মানিকিজমে সন্ন্যাস ও কঠোর জীবনযাপন গুরুত্ব পেত।

বর্তমান অবস্থা

আজ এসব ধর্ম আর সংগঠিতভাবে বিদ্যমান নেই। তবে তাদের দর্শন ও প্রভাব ইতিহাসে গভীরভাবে রয়ে গেছে। ইরানে জরথুস্ত্রী সম্প্রদায় এখনও টিকে আছে, কিন্তু মিথ্রায়িজম বা মানিকিজম কেবল ঐতিহাসিক গবেষণার বিষয়।

প্রভাব ও উত্তরাধিকার

  • মিথ্রায়িজম রোমান ধর্মচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলে, যা পরবর্তীতে খ্রিষ্টান ধর্মে কিছু প্রতীক ও আচার-অনুষ্ঠানের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
  • মানিকিজম মধ্য এশিয়া ও চীনে ধর্মীয় বৈচিত্র্য গড়ে তোলে এবং ইসলামি দার্শনিকদের চিন্তায় আলোড়ন তোলে।
  • মাজদাকিজম সমাজে ন্যায়বিচার ও সমানাধিকার নিয়ে যে আন্দোলন করেছিল, তা অনেক ইতিহাসবিদকে পরবর্তীকালের সামাজিক বিপ্লবের পূর্বসূরি হিসেবে মনে করায়।

পূর্বের পর্বঃ

(১) মরমন ধর্ম ,

(২) আমল বলতে আমরা কি বুঝি

(৩) সব নবী কেন মধ্যপ্রাচ্যে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top