কবর, মুনকির-নাকীর ও মৃতদেহ অবমাননাঃ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

ইসলামে মৃত্যুর পর কবর, জান্নাত-জাহান্নামের হিসাব, ফেরেশতা মুনকির-নাকীরের প্রশ্ন ইত্যাদি ধারণা গভীরভাবে প্রচলিত। মৌলবীরা প্রায়ই বলেন, মানুষ মারা গেলে তাকে দাফন করার পরপরই ফেরেশতা এসে প্রশ্ন করেন—“তোমার রব কে? তোমার দ্বীন কী? তোমার নবী কে?”। অর্থাৎ মৃত্যুর মুহূর্ত থেকে মানুষ আল্লাহর জিম্মায় চলে যায় এবং তার হিসাব আল্লাহর হাতে ন্যস্ত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে—একজন মৃত ব্যক্তির প্রতি সমাজের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?

কবরের মর্যাদা ও ইসলামের শিক্ষা

কুরআনে বলা হয়েছে—

“আর অবশ্যই আমি বনি আদমকে সম্মানিত করেছি…” (সূরা ইসরা ১৭ঃ৭০)

মানুষ জীবিত হোক কিংবা মৃত—তার মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নবী করীম (সাঃ) পাশ দিয়ে একটি লাশ নিয়ে যেতে দেখার সময় দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন। সাহাবারা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! এটি তো একজন ইহুদির লাশ।” তখন রাসূল (সাসঃ) বলেছিলেন—

“সে কি মানুষ নয়?” (সহিহ মুসলিম)

অর্থাৎ মৃতদেহ—হোক তা অমুসলিমের—অপমান করা বা লাঞ্ছিত করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

মৃতদেহ উত্তোলন ও পোড়ানোর ঘটনা

নুরাল পাগল নামের ব্যক্তির লাশ কবর থেকে তুলে ‘ঈমান আকিদা রক্ষা কমিটি’ নামধারী একটি গোষ্ঠী পুড়িয়েছে। লাশ পোড়ানোর সময় ধ্বনি দেয়া হয়েছে আল্লাহর নামে। অথচ ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই কাজের কোনো অনুমোদন নেই। ইসলামী শরিয়ত স্পষ্টভাবে জানায়ঃ

  • কবর ভেঙে লাশ তোলা হারাম, যদি না কোনো অত্যাবশ্যক কারণ থাকে (যেমন, দাফনের ভুল দিক, বা প্রমাণ সুরক্ষার প্রয়োজনে আদালতের নির্দেশ)।

  • মৃতদেহ পোড়ানো ইসলাম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে। এটি হিন্দু ধর্মের একটি প্রথা, কিন্তু ইসলামে দাফনই একমাত্র বৈধ পদ্ধতি।

ছবি: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি

কে বিচার করবে?

কোনো মানুষ যত পাপীই হোক না কেন, মৃত্যুর পর তার বিচার করার অধিকার কেবল আল্লাহর। কুরআনে বলা হয়েছে—

“তুমি তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে না যারা জাহান্নামী।” (সূরা বাকারাহ ২ঃ১১৯)

অর্থাৎ কোনো গোষ্ঠী, সংগঠন বা ব্যক্তি “ঈমান আকিদা রক্ষার” নামে লাশের প্রতি অবমাননা চালাতে পারে না। এতে বরং ইসলামের মূলনীতি ক্ষুন্ন হয়, আর সমাজে বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে।

সামাজিক ও নৈতিক বার্তা

এই ঘটনার মধ্যে আমরা দেখি, কবরের মর্যাদা লঙ্ঘন করা শুধু ধর্মীয় অপরাধ নয়, সামাজিক অপরাধও। মৃতদেহ উত্তোলন ও পোড়ানো পরিবার-পরিজনের জন্য মানসিক নির্যাতন এবং সমাজে ভয়-আতঙ্ক ছড়ানোর শামিল। ইসলাম এ ধরনের জুলুমকে ঘৃণা করে।

উপসংহার

ইসলামী শিক্ষার আলোকে মৃত্যু-পরবর্তী বিচার সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর এখতিয়ার। মানুষের দায়িত্ব কেবল মৃতকে সম্মানের সঙ্গে দাফন করা এবং তার জন্য দোয়া করা। লাশ উত্তোলন বা পোড়ানো ইসলামে নিষিদ্ধ, আর এটি ঈমান রক্ষা নয়—বরং মানবিক মর্যাদা ও ইসলামী মূল্যবোধ লঙ্ঘনের এক জঘন্য উদাহরণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top