ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স (Oriental Orthodox Christianity) হলো খ্রিষ্টধর্মের একটি প্রাচীন ও স্বতন্ত্র ধারা, যা ৫ম শতাব্দীতে চ্যালসেডন কাউন্সিল (Council of Chalcedon, 451 CE)–এর পর রোমান ও বাইজেন্টাইন চার্চ থেকে পৃথক হয়ে যায়।
বর্তমানে এই সম্প্রদায়ের অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৬০–৭০ মিলিয়ন, যারা মূলত মিশর, ইথিওপিয়া, আর্মেনিয়া, সিরিয়া, ভারত (কেরালা) ও ইরিত্রিয়া অঞ্চলে বাস করেন।
ঐতিহাসিক পটভূমি
চ্যালসেডন কাউন্সিলের পর যীশুর প্রকৃতি নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক থেকেই বিভাজনের সূত্রপাত।
ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স চার্চ “মিয়াফিসাইট (Miaphysite)” মতবাদে বিশ্বাস করে—যীশু খ্রিষ্ট একটিমাত্র ঐক্যবদ্ধ স্বভাবের অধিকারী, যেখানে ঈশ্বরত্ব ও মানবত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে মিলিত।
অন্যদিকে, ক্যাথলিক ও ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ বিশ্বাস করে দুই স্বভাবের (Divine and Human natures) পৃথক অস্তিত্বে।
এই তাত্ত্বিক পার্থক্যই ইতিহাসে বিভাজনের মূল কারণ হয়ে ওঠে।
সংগঠন ও নেতৃত্ব
ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স চার্চ কোনো একক পোপ বা সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের অধীন নয়; বরং এটি ছয়টি স্বতন্ত্র চার্চের সমন্বয়ে গঠিত:
- কপটিক অর্থোডক্স চার্চ (Coptic Orthodox Church of Alexandria) – মিশর
- আর্মেনিয়ান অ্যাপোস্টলিক চার্চ (Armenian Apostolic Church) – আর্মেনিয়া
- সিরিয়াক অর্থোডক্স চার্চ (Syriac Orthodox Church of Antioch) – সিরিয়া
- ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স তেহাওহেদো চার্চ (Ethiopian Orthodox Tewahedo Church) – ইথিওপিয়া
- ইরিত্রিয়ান অর্থোডক্স তেহাওহেদো চার্চ (Eritrean Orthodox Tewahedo Church) – ইরিত্রিয়া
- মালাঙ্কারা অর্থোডক্স সিরিয়ান চার্চ (Malankara Orthodox Syrian Church) – ভারত (কেরালা)
প্রতিটি চার্চের নিজস্ব Patriarch বা Catholicos আছেন, যাঁরা তাদের আঞ্চলিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
তবে বিশ্বাস, লিটার্জি ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে তারা একসূত্রে গাঁথা।
ধর্মাচার ও উপাসনা
ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স উপাসনা গভীরভাবে প্রতীকনির্ভর ও ঐতিহ্যনিষ্ঠ।
এর প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ হলো—
- প্রাচীন লিটার্জি ও গীতগান, যা সাধারণত গীয, সিরিয়াক বা কপটিক ভাষায় পরিবেশিত হয়;
- ধূপ, মোমবাতি, ঘণ্টাধ্বনি ও পবিত্র প্রতীক (Icon)–এর ব্যবহার;
- উপবাস, শুচিতা ও দান–ধ্যান–এর কঠোর চর্চা;
- সাধুদের স্মরণ ও মানবসেবার প্রতি অঙ্গীকার।
বিশেষত ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চে ইহুদি ঐতিহ্যের প্রভাব লক্ষণীয়—তারা শনিবার ও রবিবার উভয় দিনই বিশ্রাম পালন করেন এবং খাদ্যসংক্রান্ত বহু পুরনো নিয়ম এখনো রক্ষা করেন, যেমন শূকর মাংস পরিহার।
ধর্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মিক দর্শন
ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্সদের বিশ্বাসব্যবস্থায় ঐক্য, বিনয় ও ত্যাগ–এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তাদের মতে, ঈশ্বর ও মানবের সম্পর্ক কেবল প্রার্থনার মাধ্যমে নয়, বরং ধার্মিক জীবন, সামাজিক ন্যায়বোধ ও আত্মশুদ্ধির চর্চার মাধ্যমেই সত্যিকারভাবে প্রকাশ পায়।
তাদের কাছে চার্চ মানে কেবল উপাসনার স্থান নয়—এটি ঈশ্বরীয় ভালোবাসা ও মানবতার সেবার প্রতীক।
উপসংহার
ওরিয়েন্টাল অর্থোডক্স চার্চ আজও সেই প্রাচীন খ্রিষ্টধর্মের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখেছে,
যেখানে গৌরব বা আধুনিকতার ঝলক নয়, বরং বিশ্বাস, ত্যাগ ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধনই ধর্মজীবনের মূল সারবত্তা।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে এই সম্প্রদায় খ্রিষ্টধর্মের এক গভীর, শুদ্ধ ও অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে।








Leave a Reply