ভূমিকা
মানব ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল, যেখানে বিজয়ী কোনো নেতা শত্রুদের রক্তের বদলে ক্ষমার সুধা বিলিয়েছেন। হজরত মুহাম্মদ (সা:)-এর মক্কা বিজয় (ফাতহে মক্কা) সেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ—যেখানে প্রতিশোধের স্থানে জায়গা নিয়েছিল মানবতা, ন্যায়বোধ ও দয়া।
মক্কা বিজয়ের প্রেক্ষাপট
প্রায় দুই দশক ধরে মক্কার কাফের ও কুরাইশরা মুসলমানদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল—তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও নির্বাসনে বাধ্য করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত, ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে (হিজরি ৮ সালে) নবী মুহাম্মদ (সা:) দশ হাজার সাহাবিকে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মক্কায় প্রবেশ করেন।
মক্কার অধিবাসীরা তখন ভয়ে কাঁপছিল—আজ নিশ্চয়ই প্রতিশোধ নেওয়া হবে। কিন্তু নবীর মুখে উচ্চারিত হলো এক বাণী, যা বিশ্ব ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
নবী (সাঃ)-এর ঐতিহাসিক ঘোষণা
কাবা শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন—
“আজ তোমাদের প্রতি আমার কথা হলো — তোমরা সবাই মুক্ত।“
(ইবন হিশাম, সীরাতুন্নবী)
এই এক বাক্যেই মক্কার ইতিহাসে রক্তপাতের অধ্যায় চিরতরে মুছে গেল। যাঁরা বছরের পর বছর মুসলমানদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, তাঁরাই আজ নবীর দয়া ও মানবিকতার ছায়ায় আশ্রয় পেলেন।
প্রতিপক্ষদের প্রতি নবীর আচরণ
- আবু সুফিয়ান — ইসলামের দীর্ঘদিনের শত্রু ছিলেন। নবী (সাঃ) তাঁকেও ক্ষমা করে ঘোষণা দেন,
“যে আবু সুফিয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ।”
- হিন্দা — হামযা (রাঃ)-এর দেহ বিকৃতকারী নারী; তাকেও ক্ষমা করা হয়।
- ইকরিমা ইবনে আবি জাহল — বহু যুদ্ধে ইসলামের ক্ষতি করেছেন, তিনিও ক্ষমা পান।
এই আচরণের মাধ্যমে নবী (সা.) ঘোষণা করলেন—ইসলাম প্রতিশোধের নয়, বরং শান্তি ও ক্ষমার ধর্ম।
ইসলামে সহিংসতার অবস্থান
কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে:
“ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই।“
— (সূরা আল–বাকারা ২:২৫৬)
“যদি তারা শান্তির দিকে ঝোঁকে, তবে তুমিও শান্তির দিকে ঝোঁক।“
— (সূরা আল–আনফাল ৮:৬১)
অতএব, ইসলাম কেবল আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধের অনুমতি দেয়, কখনোই আক্রমণ বা প্রতিশোধমূলক সহিংসতা বৈধ করে না।
মানবতার এক অনন্য শিক্ষা
ফাতহে মক্কার এই ঘটনায় নবী (সাঃ) প্রমাণ করেন—
🔹সত্যিকারের নেতৃত্ব হলো ক্ষমার সাহস,
🔹 মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা,
🔹 এবং শত্রুর প্রতিও ন্যায়বিচার করা।
এ কারণেই ইতিহাসবিদরা একে বলেন,
“এটা কোন শহরের জয় ছিল না, বরং হৃদয়ের জয় ছিল।”
কারণ, নবীজি মক্কা জয়ের পরেও তিনি তার সাথী যারা তাঁর সাথে হিজরত করেছিলন, তাঁরা কিন্তু মদিনাতেই ফিরে যান।
সারসংক্ষেপ
| বিষয় | ব্যাখ্যা |
| ঘটনা | মক্কা বিজয় (৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) |
| নবীর আচরণ | সাধারণ ক্ষমা, প্রতিশোধ নয় |
| সহিংসতা | আত্মরক্ষা ছাড়া জায়েজ নয় |
| মূল বার্তা | শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, মানবতা |
উপসংহার
নবী মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জীবন আমাদের শেখায়—ক্ষমা প্রতিশোধের চেয়ে মহান। ইসলাম কোনো যুদ্ধ বা জুলুমের ধর্ম নয়; এটি ন্যায় ও শান্তির ধর্ম, যেখানে মানুষের প্রতি দয়া ও সহিষ্ণুতা-ই সর্বোচ্চ নীতিমালা। এ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে।








Leave a Reply